প্রতীকহীন স্থানীয় নির্বাচনেও ফ্যাক্টর রাজনৈতিক সমর্থন

প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাজিমাত করতে মরিয়া মাঠের রাজনৈতিক দলগুলো। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ক্ষমতাসীন বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ। দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও তারা আশানুরূপ ফলাফল চান। হাইকমান্ডের নির্দেশে দলীয়ভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সুফল তৃণমূল নির্বাচনে কাজে লাগানোর নির্দেশনা রয়েছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাজিমাত করতে মরিয়া মাঠের রাজনৈতিক দলগুলো। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ক্ষমতাসীন বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ। দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও তারা আশানুরূপ ফলাফল চান। হাইকমান্ডের নির্দেশে দলীয়ভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সুফল তৃণমূল নির্বাচনে কাজে লাগানোর নির্দেশনা রয়েছে।

অন্য দিকে মাঠের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অন্যান্য দলও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে তৎপর। তবে তাদের অভিযোগ, বিএনপি সরকারের অধীনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনগুলোতে যেভাবে জবরদখল হয়েছে, তাতে স্থানীয় নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হবে কি না-তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা না হলেও মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ঠিকই বজায় থাকবে। প্রার্থীরা সরাসরি দলীয় প্রতীক না পেলেও নিজ নিজ দলের আদর্শ, স্থানীয় বলয় এবং কর্মী-সমর্থকদের ওপর নির্ভর করেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইবেন। প্রার্থীরা দলীয় পরিচয় আড়াল করতে চাইলেও ভোটারদের কাছে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট থাকবে। ফলে নির্বাচনে দলীয় প্রভাব এড়ানোর সুযোগ নেই।

ঈদ শুভেচ্ছার আড়ালে সম্ভাব্য প্রার্থীরা উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ গোছাচ্ছেন। অনেকেই নিজেকে ‘দলীয় প্রার্থী’ হিসেবে প্রচার করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতীক না থাকলেও দল যাকে সমর্থন দেবে, তিনিই দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পাবেন। এর বাইরে কেউ নির্বাচন করতে চাইলে তাকে বিরত রাখতে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের আশঙ্কা রয়েছে, যা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন : “প্রতীক না থাকায় নির্বাচন প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে ঠিকই, তবে দলীয়ভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও অনেকে দল থেকে বহিষ্কার বা হেনস্তার ভয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করার সাহস পাবেন না। এ ছাড়া দলীয় প্রভাবের কারণে কেন্দ্র দখল, বিরোধী পক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং ভোটারদের বাধা দেয়ার পুরনো প্রবণতা ফিরে আসতে পারে।”

দলীয় প্রতীক না থাকার সরকারি ঘোষণায় একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এতে প্রার্থীর সংখ্যা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীও নীরবে মাঠ গোছাচ্ছেন। তারা এখনই প্রকাশ্য প্রচারণায় না গিয়ে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী হতে পারেন, যাতে আগেভাগে প্রশাসন বা স্থানীয় প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হতে না হয়।

ইসি সূত্র জানায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নের বিধান বাতিল হলেও এরই মধ্যে কয়েকটি দল প্রকাশ্যে সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এতে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসি। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলো চাইলে প্রকাশ্যে না এনে গোপনেও সমর্থন দিতে পারত। এ ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোর সম্পৃক্ততার আইনি সীমা কতটুকু, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, যা আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে দলের মালিকানার বিষয়টি থাকত না। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে বসে বিষয়টির একটা ফয়সালা করা।” তিনি আরো বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐতিহাসিকভাবেই সংঘাতের ঘটনা বেশি হয়েছে। এই নির্বাচনে রক্তপাত বন্ধ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা একটি রক্তপাতহীন নির্বাচন চাই এবং এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, দলীয় সমর্থনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে। সমর্থন না দিলে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়তে পারে, আবার সমর্থন দিলে একজন প্রার্থীর পক্ষে দলের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, যা সহিংসতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তখন প্রার্থী নিজেকে ক্ষমতাধর ভেবে দলের প্রভাব কাজে লাগাতে পারেন। দল কতটুকু ইনভলভ হতে পারবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিল।

ইসি ও সুজনের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে ২৩৬ জন এবং ২০২১ সালে প্রায় ১১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে ২০০৩ সালে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০ জন নিহত হন। আধিপত্য বিস্তার ও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাই এসব সহিংসতার প্রধান কারণ।

আসন্ন নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘শেরপুর ও বগুড়ার উপ-নির্বাচনে কী ঘটেছে আপনারা দেখেছেন। আমরা শঙ্কিত আদৌ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি না। সব সঙ্কটের সমাধান হচ্ছে জনগণের ম্যান্ডেট। জনগণ জাগলে সব ঠিক হবে।’

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মাদ ঈসা ইবন বেলাল বলেন, সরকার আন্তরিক হলে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব নয়। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে যেন পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেতাত্মারা আবার প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, “ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দেখেই আমাদের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। তবে কাউকে প্রার্থী হতে বাধা দেয়া হবে না। বিএনপি সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে এবং কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার বা হুমকি-ধমকি সহ্য করা হবে না।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ভোট চুরি ও দুর্নীতির কারণে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কলঙ্কিত হয়েছে। প্রতীকহীন নির্বাচনে দলগুলো সরাসরি মাঠে না থাকলেও প্রার্থীর পেছনে ‘অদৃশ্য সুতো’ ধরে টানবে ঠিকই। তবে এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিরপেক্ষতা, আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ এবং কালো টাকা ও পেশী শক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার ওপর। এটি নিশ্চিত করা গেলেই স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় সত্যিকারের জনমুখী সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।