নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় কেন সম্পদের প্রকৃত চিত্র আসে না

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের হলফনামা দেখলে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে এতে কি সত্যিই তাদের প্রকৃত সম্পদের চিত্র প্রতিফলিত হয়? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় না। এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে একাধিক কারণ কাজ করে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের হলফনামা দেখলে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে এতে কি সত্যিই তাদের প্রকৃত সম্পদের চিত্র প্রতিফলিত হয়? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় না। এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে একাধিক কারণ কাজ করে।

১. স্বঘোষণাভিত্তিক ব্যবস্থার মৌলিক সীমাবদ্ধতা : সম্পদের হলফনামা মূলত ংবষভ-ফবপষধৎধঃরড়হ বা স্বঘোষণাভিত্তিক। প্রার্থী নিজেই নিজের সম্পদের হিসাব দেন। এই ঘোষণার সত্যতা যাচাই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে শক্তিশালী, স্বয়ংক্রিয় ও তাৎক্ষণিক যাচাইব্যবস্থা নেই। ফলে তথ্য গোপন, কম দেখানো বা আংশিক প্রকাশ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় না।

২. আইনি কাঠামোর দুর্বল প্রয়োগ : আইনে মিথ্যা তথ্য দিলে শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে হলফনামায় ভুল বা গোপন তথ্য দেয়ার কারণে কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বা কার্যকর শাস্তি হয়েছে। ফলে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি এই হিসাবটাই অনেকের কাছে যৌক্তিক মনে হয়।

৩. সম্পদের সংজ্ঞা ও পরিসরের অস্পষ্টতা : হলফনামায় যেসব সম্পদের হিসাব দিতে হয়, তার সংজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত ও পুরনো। এতে বিদেশে রাখা সম্পদ, বেনামি সম্পত্তি, আত্মীয়স্বজন বা সহযোগীদের নামে রাখা সম্পদ, অফশোর কোম্পানি বা শেয়ারহোল্ডিং- এসব সহজেই আড়াল করা যায়। আইনি কাঠামো এগুলো ধরার মতো আধুনিক আর্থিক বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৪. কর তথ্য ও হলফনামার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব : একজন প্রার্থীর আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন, ভূমি রেকর্ড ও নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামার তথ্য এই চারটির মধ্যে কার্যকর ডেটা সমন্বয় নেই। ফলে এক জায়গায় যা দেখানো হচ্ছে, অন্য জায়গায় তার সাথে অসামঞ্জস্য থাকলেও তা সহজে ধরা পড়ে না।

৫. রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ‘নর্মালাইজড’ অসত্য : দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রশ্নের মুখে পড়লেও তা বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নেয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সম্পদ বাড়াকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’ হিসেবে মেনে নেয়া হয়। এই সামাজিক-রাজনৈতিক সহনশীলতা অসত্য ঘোষণাকে উৎসাহিত করে।

৬. নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা : নির্বাচন কমিশনের হাতে তদন্তকারী সংস্থা, ফরেনসিক অডিট বা স্বতন্ত্র আর্থিক অনুসন্ধানের ক্ষমতা সীমিত। তারা মূলত কাগজপত্র গ্রহণকারী ও সংরক্ষণকারী ভূমিকা পালন করে। শক্তিশালী নজরদারি ক্ষমতা ছাড়া হলফনামা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

৭. ভোটারের তথ্য ব্যবহারের সীমা : হলফনামা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলেও সাধারণ ভোটারের পক্ষে সেসব তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই ও তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়। গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির সক্রিয় অনুসন্ধান ছাড়া এই তথ্য রাজনৈতিক জবাবদিহির কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে না।

নির্বাচন কমিশনে নেতাদের সম্পদের হলফনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারণা কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা নয়, বরং স্বচ্ছতার দাবি মাত্র। প্রকৃত চিত্র না আসার কারণ ব্যক্তিগত অসততা যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।

যদি সত্যিই হলফনামাকে কার্যকর জবাবদিহির হাতিয়ার করতে হয়, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয় ও আন্তঃসংস্থাগত তথ্য যাচাই; মিথ্যা ঘোষণায় তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান শাস্তি; সম্পদের সংজ্ঞার আধুনিকায়ন এবং নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধান ক্ষমতা বৃদ্ধি।

অন্যথায়, সম্পদের হলফনামা গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ নথি না হয়ে কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র হয়েই থেকে যাবে।

এবার উল্লেখযোগ্য নেতাদের সম্পদ ঘোষণার মূল তথ্য

তারেক রহমান (বিএনপি) : বিএনপি নেতা ও দলীয় কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার হলফনামায় প্রায় ১৯.৭ মিলিয়ন টাকা (১.৯৭ কোটি টাকা) সম্পদের হিসাব দেখিয়েছেন। তিনি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আয় হিসাবে প্রায় ৬.৭৬ লাখ টাকা দেখিয়েছেন, যা মূলত শেয়ার, সেভিংস, বন্ড ও ব্যাংক ডিপোজিট থেকে এসেছে। তার নামে নগদ, ব্যাংক আমানত এবং স্ত্রীর নামে আমানতির হিসাবও রয়েছে।

ডা: শফিক (জামায়াত) : ঢাকা-১৭ আসনে ডা: শফিকুর রহমানের (জামায়াতে ইসলামী আমির) নির্বাচনী হলফনামায় মোট ১ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬৪০ টাকা সম্পদ ঘোষণা করেছেন। নগদ অর্থ রয়েছে হাতে ও ব্যাংকে মোট ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। নিজের নামে ১১.৭৭ শতক জমির ওপর ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য ২৭ লাখ টাকা এবং ১০ ভরি স্বর্ণ থাকা ঘোষণা করেছেন। এর বাইরে ২.১৭ একর কৃষিজমি, যেটির আনুমানিক মূল্য ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন কোম্পানির বন্ড, ডেবেঞ্চার ও শেয়ার হিসাবে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৮০ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

মুফতি ফাইজুল করিম (ইসলামী আন্দোলন) : ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ফাইজুল করিম তার হলফনামায় মোট সম্পদের হিসাব প্রায় ১.৬৪ কোটি টাকা দেখিয়েছেন এবং তার স্ত্রীর নামে ১৮৭ ভরি স্বর্ণ থাকার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সাইফুল হক (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি) : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী সাইফুল হক তার আয় হিসেবে ৪.২ লাখ টাকা বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন, যা তিনি মূলত টক শোতে গেস্ট হিসেবে অংশগ্রহণ থেকে আয় করেন বলে উল্লেখ করেছেন।

আখতার হোসেন (এনসিপি) : জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য-সচিব আখতার হোসেন তার হলফনামায় ২৭ লাখ টাকা চলমান অস্থাবর সম্পদ ঘোষণা করেছেন এবং পাশাপাশি দুইটি বিচারাধীন মামলা তুলে ধরেছেন।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি (এনসিপি) : জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি মোট সম্পদ ঘোষণা করেছেন ৪০ লাখ টাকার। এর মধ্যে নগদ টাকা : ২৫ লাখ; ব্যাংক ব্যালেন্স : প্রায় হাজার টাকা; সোনা : ১০ লাখ টাকা।

জোনায়েদ সাকী (গণসংহতি পরিষদ) : ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে প্রার্থী জোনায়েদ সাকী নিজস্ব সম্পদ ঘোষণা করেছেন প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। আর স্ত্রীর সম্পদ ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। নিজেকে তিনি ‘পাবলিশার’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

ডা: তাসনীম জারা (স্বতন্ত্র, ঢাকা-৯) : ডা: তাসনীম জারা ১৯ লাখ ১৪ হাজার টাকার সম্পদ ঘোষণা করেছেন। তার বার্ষিক আয় : ৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। তার নগদ প্রায় ১৬ লাখ টাকা এবং সোনার মূল্য লাখ টাকার।