সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে জাজিরার মসলা ফসল

Printed Edition
জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধনিয়ার আবাদ  : নয়া দিগন্ত
জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ধনিয়ার আবাদ : নয়া দিগন্ত

মো: বোরহান উদ্দিন রব্বানী শরীয়তপুর

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করছে উচ্চমূল্যের মসলা ফসলের আবাদ। ধান, পাটসহ প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি এখন কৃষকেরা ঝুঁকছেন পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া ও কালোজিরার মতো মসলাজাতীয় ফসল চাষে। তুলনামূলক কম ঝুঁকি, কম খরচ, ভালো বাজারদর এবং দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ সুবিধা- এই চারটি কারণে মসলা ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন। বিশেষ করে ধনিয়া ও কালোজিরা চাষে কৃষকদের ঝোঁক সবচেয়ে বেশি।

জাজিরার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের পলিযুক্ত বালুমাটি মসলা ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মাটির গঠন, পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও অনুকূল আবহাওয়া মিলিয়ে এখানে ধনিয়া ও কালোজিরার ফলন বেশ ভালো হয়। ফলে কৃষকেরা কম খরচে বেশি লাভের আশায় ধীরে ধীরে জমির বড় একটি অংশ এসব ফসলের আওতায় নিয়ে আসছেন। পাশাপাশি পেঁয়াজ ও রসুনের আবাদও দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধনিয়া ও কালোজিরা চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়। অন্যান্য ফসলের মতো অতিরিক্ত কীটনাশক বা নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। এতে উৎপাদন খরচ কমে এবং লাভের পরিমাণও বাড়ে। এ ছাড়া এই ফসলগুলো দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করা যায়। ফলে কৃষকেরা বাজারদর অনুকূলে এলে বিক্রি করতে পারেন। এতে লোকসানের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসে।

হিসেব অনুযায়ী, কালোজিরা আবাদে বিঘাপ্রতি খরচ পড়ে প্রায় ২১ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে তা বিক্রি হয় ৫২ থেকে ৫৪ হাজার টাকায়। অন্য দিকে ধনিয়া চাষে বিঘাপ্রতি খরচ হয় ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা এবং বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায়। ফলে স্বল্প বিনিয়োগে লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

উপজেলার কুণ্ডেরচর ইউনিয়নের কৃষক হামেদ খাঁ বলেন, আগে আমরা মূলত ধান চাষ করতাম। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তায় ধান চাষে অনেক সময় লোকসান গুনতে হতো। এখন ধনিয়া ও কালোজিরা চাষ করে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভ পাচ্ছি। এ বছর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে কালোজিরা ও দুই বিঘা জমিতে ধনিয়া আবাদ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো লাভের আশা করছি।’

একই উপজেলার ফকির মাহমুদ আকনকান্দি গ্রামের কৃষক দীল মোহাম্মদ মাদবর জানান, গত সাত-আট বছর ধরে তিনি মসলা ফসল চাষ করছেন। তিনি বলেন, ‘কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও নিয়মিত পরামর্শের ফলে আগের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছি। চার-পাঁচ বছর ধরে জমিতে মৌ-বাক্স স্থাপন করছি। এতে পরাগায়ন বেড়ে যাওয়ায় ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি মধু বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে।’

জাজিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: ওমর ফারুক জানান, উচ্চমূল্যের মসলা ফসলের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দেয়ার মাধ্যমে সহায়তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ধনিয়া ও কালোজিরা দীর্ঘ দিন সংরক্ষণযোগ্য হওয়ায় কৃষকেরা বাজার সুবিধা অনুযায়ী বিক্রি করতে পারেন। এ ছাড়া মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন বাড়িয়ে ফলন বৃদ্ধি করাও সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকের আয় বাড়াতে সহায়ক।’

উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে জাজিরায় প্রায় দুই হাজার ৩৯৩ হেক্টর জমিতে ধনিয়া এবং এক হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে কালোজিরার আবাদ হয়েছে। যা আগের বছরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

এ দিকে স্থানীয় বাজারেও এসব মসলা ফসলের চাহিদা বাড়ছে। জাজিরার কাজিরহাটে গড়ে উঠেছে ধনিয়া ও কালোজিরার বড় পাইকারি হাট। এখানে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনে থাকেন। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং কোনো ধরনের ফরিয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী জায়গা করে নিতে পারছেন না। একই সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব মসলা সরবরাহ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জাজিরায় মসলা ফসলের আবাদ শুধু কৃষকের আয়ের নতুন পথই তৈরি করছে না, কৃষিতে বৈচিত্র্যও নিয়ে আসছে। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জাজিরা মসলা উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।