বিকল টার্মিনাল থেকে ৩-৪ দিনের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ আংশিক চালুর আশা

ডায়িং কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে : ওভেন ইউনিটগুলোতেও সঙ্কট

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহ কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে চলতি মাসের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তারা অবশ্য ৩/৪ দিনের মধ্যে বিকল হওয়া টার্মিনালটি হতে আংশিক সরবরাহ চালু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। কিন্তু টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হওয়ার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ বলেও সূত্র জানিয়েছে। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় রফতানিমুখী গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্প বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পেট্রোবাংলার একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অগ্নিদুর্ঘটনার শিকার টার্মিনালটিতে গত বৃহস্পতিবার থেকে ত্রুটি সারাতে কাজ শুরু করেছে যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল। তারা শুরুতে অত বয়লারটি চালু করার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এক্সিলারেট টার্মিনালের অত বয়লারটি চালু করা যায়নি। বৈদ্যুতিক ক্যাবল পুনস্থাপন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তা ছাড়া পুড়ে যাওয়া ক্যাবলসহ যন্ত্রাংশগুলো আমদানি করে আনতে হচ্ছে, ফলে সময় যাচ্ছে। আমদানিকৃত ক্যাবল ও যন্ত্রাংশ দেশে পৌঁছার পর কাজ শেষ করতে আরো ৩/৪ দিন লাগবে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব ক্যাবল ও যন্ত্রাংশের একাংশ ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং বিশেষ ব্যবস্থায় সেগুলো কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আজ বুধবার নাগাদ দেশে আসা যন্ত্রাংশ টার্মিনালটিতে প্রতিস্থাপনের জন্য মিলতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

লাইনে চাপ সঙ্কট, ভুগছে রফতানিমুখী শিল্প

মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের একটি অগ্নিকাণ্ডে বিকল হওয়ার ফলে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসের লাইনে চাপ না থাকায় গ্যাসনির্ভর সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো গার্মেন্ট কারখানার ওভেন ইউনিটগুলোর বেশির ভাগই গ্যাসনির্ভর। বিদ্যুৎনির্ভর ওভেন ইউনিট থাকলেও বেশির ভাগই গ্যাসনির্ভর। ফলে তৈরী পোশাকের ফিনিশিং নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে সময়মতো জাহাজীকরণসহ ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। শিল্পমালিকরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে অনিশ্চয়তা যেমনি দেখা দেবে, তেমনি নির্ধারিত সময়ে বিদেশী বায়ারদের ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

তা ছাড়া টেক্সটাইল ও ডায়িং কারখানাগুলো পুরোপুরিই গ্যাসনির্ভর। বিজিএমইএর পরিচালক সাইফউল্লাহ মানসুর নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ সঙ্কট তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। ফলে ডায়িং কারখানাগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। তা ছাড়া ওভেন ইউনিটগুলোর গ্যাসনির্ভর আয়রণ সঙ্কটে পড়েছে। ফলে কার্যাদেশ অনুযায়ী তৈরী পোশাক ডেলিভারি দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ দিকে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা পুরোটাই এলএনজিনির্ভর হওয়াতে চট্টগ্রামে এই সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাস সঙ্কটের কারণে চট্টগ্রামে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রাষ্ট্রায়ত্ত সারকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প কারখানায়ও উৎপাদন কমছে। রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। সিএনজিচালিত যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সীমিত পরিমাণ গ্যাস নিয়ে পাম্প থেকে ফিরতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেয়া হচ্ছে ২২৬ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। সূত্র বলছে সারা দেশে তিন হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান হওয়ার কথা থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার দুই হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান মিলেছে। এর মধ্যে আবার এলএনজির একটি টার্মিনাল থেকে জোগান এসেছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যদিও এলএনজির জোগান হওয়ার কথা ১১শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে ভাসমান দু’টি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এলএনজি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সামিটের অপর টার্মিনালটি থেকে এখন এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে। ফলে গ্যাস সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ দিকে গ্যাস সঙ্কটে বন্ধ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল, রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দু’টি ইউনিট, শিকলবাহাসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও গতকাল সরবরাহ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩৬.৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া সারকারখানায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বহুজাতিক কাফকোকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএল বন্ধ রাখা হয়েছে।

চাপ কম সিএনজি স্টেশনেও

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাসহ সবগুলো খাত বেকায়দায় পড়েছে। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রতিটি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সিএনজি চালক হারুণ নয়া দিগন্তকে বলেন, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৮০ টাকার গ্যাস দিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় রান্নাঘরের চুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঙ্কট তৈরী হয়েছে।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের এক্সপেরিয়েন্স একেবারেই নতুন। অক্ষত বয়লারটি চালু করে আংশিক সচল করার একটি উদ্যোগ শুরুতেই নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। এখন বিদেশী বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি জানান, টার্মিনালটি সচল হতে আরো কমপক্ষে ১০ দিন লেগে যেতে পারে।

এলএনজি আমদানিসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রামস্থ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার কারণ এখনো আমরা অফিসিয়ালি পাইনি। আমাদের টিম ত্রুটি সারাতে কাজ করছে। কবে নাগাদ সচল হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আগামী ৩/৪ দিনের মধ্যে আংশিক সুখবরের বিষয়ে আমরা আশা করছি। ওই সময়ের মধ্যে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে এমন আশাবাদ এই কর্মকর্তার। পুরোপুরি সচল হতে আরো সময়ের প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মো: শফিকুল ইসলাম গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে জানান, এখন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। বিদেশী বিশেষজ্ঞরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেসব যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে এর একটি অংশ দেশে পৌঁছেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ ব্যবস্থায় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।