বিশেষ সংবাদদাতা
রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকার নতুন করে টাকা ছাপানো শুরু করেছে। শুধু মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটা হাইপাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। অর্থাৎ এটার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘ইভলভিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ ফর ট্রেড অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক মাসিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এ তথ্য প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় ছিল অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)।
মূল প্রবন্ধে আশিকুর রহমান বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে আমরা সংস্কার থেকে পিছিয়ে গেলে সেটা আত্মঘাতী হবে। আশা করছি সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন পর্যালোচনা করবে। সংস্কার থেকে পিছিয়ে এসে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনশন সৃষ্টি করেছে।’
অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগে ধীরগতির অন্যতম কারণ জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা উদ্যোক্তাদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করছে। তারা গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন কি না সে চিন্তা করছেন।
তিনি আরো বলেন, এর সাথে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁঁকি বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে চাপে ফেলছে- উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারকদের আরও সতর্ক হতে হবে এবং অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে।’ একই সাথে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রয়োজনে ব্যাংক একীভূতকরণের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআইজিডির ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকেই একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে।’ তিনি বলেন, দেশে এক ধরনের ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ গড়ে উঠেছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে। তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি থাকলেও সুশাসনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।’ বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ছাপিয়ে ভর্তুকি দেয়া হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো আইএমএফের শর্ত নয়; বরং এগুলো ‘ন্যাশনাল ইকোনমিক ইম্পারেটিভস’ বা জাতীয় অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ‘স্ব-আরোপিত ক্ষত’ হয়ে দাঁড়াবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের পক্ষে কঠোর সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১ সালে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের নজির রয়েছে, যা অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।’ বর্তমান পরিস্থিতিও তেমন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল বলে তিনি মনে করেন এবং এ ক্ষেত্রে আইএমএফের সমর্থন সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তানজিমা মোস্তফা। অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক বজলুল এইচ খন্দকার।
এ দিকে, পিআরআই প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৩%-এ দাঁড়িয়েছে, যা কোভিড-১৯ এর পর থেকে সবচেয়ে দুর্বল দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের পারফরম্যান্স। দুর্বল রফতানি, জ্বালানি ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের কারণে উন্নয়ন অংশীদাররা ২০২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে প্রায় ৩.৮-৪%-এ নামিয়ে এনেছে। পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) ফেব্রুয়ারির ৫৫.৭ থেকে মার্চে ৫৩.৫-এ নেমে এসেছে, যা ধীরগতির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্বল বাহ্যিক চাহিদা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন ও নির্মাণ খাত সঙ্কুচিত হয়েছে, তবে সেবা খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, টানা আট মাস ধরে রফতানি সঙ্কুচিত হয়েছে এবং ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে তা বার্ষিক ভিত্তিতে ৪.৮৫% কমেছে, যা শুল্ক অনিশ্চয়তার মধ্যে দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা এবং বাণিজ্য পুনর্গঠনকে প্রতিফলিত করে।
একই সময়ে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপির প্রায় ০.৮-১% চলতি হিসাবের ঘাটতিতে অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পিআরআই আরো উল্লেখ করেছে যে, যদিও রেমিটেন্স শক্তিশালী রয়েছে, এর প্রায় অর্ধেক আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সাথে সম্পর্কিত ঝুঁঁকির মুখে এ প্রবাহকে ফেলছে। ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং আমদানির চাপ লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করছে। আর্থিক খাত কাঠামোগতভাবে দুর্বল রয়ে গেছে, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি, এবং উচ্চ সুদের হার ও ঝুঁঁকি এড়ানোর প্রবণতার কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি মন্থর রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ব্যাংক থেকে সরকারের বর্ধিত ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করার ঝুঁঁকি তৈরি করছে।
রাজস্বের ওপর চাপও তীব্র হচ্ছে, যেখানে জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সীমিত। প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ ট্রিলিয়ন(এক লাখ কোটি টাকা) থেকে ১.৩ ট্রিলিয়ন(এক লাখ ৩০ কোটি) টাকার মধ্যে হতে পারে, এবং জ্বালানি ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।



