সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজধানীর সব বিনোদনকেন্দ্রে অর্ধকোটি মানুষের সমাগম হয়েছে। সরেজমিন লালবাগ কেল্লা, রমনা পার্ক, ধানমন্ডি লেক, সংসদ ভবন, জিয়া উদ্যান, আহসান মঞ্জিল, হাতিরঝিল, মিরপুর চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে দেখা গেছে এমন চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার রাজধানীর সব বিনোদনকেন্দ্রে প্রায় অর্ধকোটি লোকের সমাগম হয়। শুধু জাতীয় চিড়িয়াখানাতেই যাতায়াত করেছে সাড়ে চার লাখ মানুষ। এ ছাড়া ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে নগরবাসী ভিড় করেন বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে। বিগত কয়েকদিন এসব জায়গায় ছিল উল্লেখযোগ্য দর্শনার্থীর উপস্থিতি। পরিবার-পরিজন নিয়ে সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মুখর নগরীর সব বিনোদনকেন্দ্র।
মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও জিয়া উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। এই দুই বিনোদনকেন্দ্রের সামনের প্রায় অর্ধ কিলোমিটারজুড়ে ছিল মানুষের ভিড়। একপর্যায়ে যান চলাচলও এই রাস্তায় বন্ধ করে দেয়া হয়। জিয়া উদ্যানেও ছিল সরব উপস্থিতি। বেলা বাড়ার সাথে সাথেই বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। রাজধানীর অন্যতম এসব বিনোদনকেন্দ্রে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা মূলত পরিবারের সাথে নিজেদের মতো করে সময় কাটানোর জন্যই এখানে এসেছেন।
চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, এবার চিড়িয়াখানার ইতিহাসের সর্বোচ্চ দর্শনার্থী এসেছে। সব মিলিয়ে এবার সোমবার পর্যন্ত সাড়ে চার লাখ দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় এসেছে। তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডিএমপি পুলিশ, র্যাব ও টুরিস্ট পুলিশ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় কাজ করছে। পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী, আনসার বাহিনী এবং অন্যান্য কর্মচারীরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে। ফলে দর্শনার্থীরা মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে আসা-যাওয়া করতে পারছেন এবং চিড়িয়াখানার ভেতরেও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়িয়ে উপভোগ করতে পারছেন।
জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদের দিন চিড়িয়াখানায় আসেন ৮০ হাজার দর্শনার্থী। ঈদের দ্বিতীয় দিন তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে এক লাখ ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সোমবার এক লাখ ৭০ হাজারের মতো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে চিড়িয়াখানায়। গত বছরের ঈদুল ফিতরের দিন এক লাখ দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল। পরদিন এক লাখ ৭০ হাজার এবং ঈদের তৃতীয় দিন এক লাখ ৫০ হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল।
মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্য, অসমাপ্ত নির্মাণের রহস্য আর প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস- এই তিনের মেলবন্ধন আজও মানুষকে আকর্ষণ করে ঢাকার লালবাগ কেল্লার দিকে। ঈদের ছুটিতে সেই আকর্ষণ যেন আরো বহুগুণ বেড়ে যায়। ঈদে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা মুখর দর্শনার্থীদের পদচারণে। কেউ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে, কেউ এসেছেন আশপাশের জেলা থেকে। বেলা গড়িয়ে যখন বিকেল, তখন সেই ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কেল্লার ভেতরে ঢুকেই দর্শনার্থীদের ভিড় জমে পরী বিবির মাজারে। মার্বেল পাথরের নকশা আর নিস্তব্ধ পরিবেশ অনেককেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন স্থাপত্যের সূক্ষ্ম সৌন্দর্যে। এরপরই অনেকে ছোটেন লালবাগ মসজিদের দিকে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন দর্শনার্থীরা। দেওয়ান-ই-আম বা দরবার হলও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র। এখানে সংরক্ষিত পুরনো নিদর্শন, ব্যবহার্য সামগ্রী দেখে অনেকে মুগ্ধ হন। ইতিহাসের পাতা যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে তাদের সামনে। কেল্লার বাগান ও খোলা প্রাঙ্গণও ছিল মুখর। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে বসে পড়েন সবুজ ঘাসে, কেউ হাঁটেন, আবার কেউ ব্যস্ত হয়ে ওঠেন স্মৃতি বন্দী করতে।
একই অবস্থা ছিল রাজধানীর জিয়া উদ্যানের। ছোট ছোট শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, বাঁশির সুর, ফুচকাওয়ালার দোকানে টুপটাপ শব্দ আর বিভিন্ন বয়সী মানুষের হাসি-আনন্দ ও কথোপকথন- সব মিলেমিশে উদ্যান ছিল মুখর। যেন অদ্ভুত এক সঙ্গীতময় কোলাহল তৈরি হয়েছে চারপাশে। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা লেকের পানিও বিকেলের আলোয় চকচক করছে; গাছে গাছে মাখামাখি চলছে নতুন পাতার সবুজাভ হাসিতে।
সরেজমিন দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীরা বন্ধুদের সাথে ছবি তুলছে, কেউ সেলফি তুলছে, কেউবা ভিডিও করছে। প্রাপ্তবয়স্করা লেকপারে বসে বা দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। অনেকের আকর্ষণের মূল কেন্দ্র ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধি। অনেককে সমাধি ঘিরে ছবি তুলতে বা ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। কেউ কেউ সমাধির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান।
শিশুদের কাউকে কাউকে লেকের ধারে পায়ে পানি লাগিয়ে খেলতে দেখা গেছে। অভিভাবকরাও তাদের সাথে তাল মেলাচ্ছে। পরিবারের আনন্দ, বন্ধুদের আড্ডা আর শিশুদের খেলা- সব মিলিয়ে নিখুঁত এক বিকেল যেন নেমে আসে জিয়া উদ্যানের সবুজ আঙিনায়। উদ্যানের অন্য এক কোণে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে ধীর পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। তারা ছবিও তুলছিলেন। কথায় ও গল্পে মেতে উঠেছিলেন হাস্যরসে।
জাতীয় জাদুঘরেও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। জাদুঘরে আসা দর্শনার্থীদের বেশিরভাগই শিশু-কিশোর। সংগ্রহশালাটিতে তাদের আগ্রহই বেশি। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লাইন দিয়ে জাতীয় জাদুঘরে প্রবেশ করছেন দর্শনার্থীরা। দর্শনার্থীদের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। তারা পরিবারের বাবা-মা এবং ভাই-বোনের সাথে এসেছে। প্রথমে গেটের বাইরে থেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন। তারপর ভেতরে গিয়ে ব্যাগ কাউন্টারে জমা দিয়ে মূল মিউজিয়ামে প্রবেশ করেন।
ঈদের ছুটিতে রাজধানীর অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝে এই সময়টুকু পরিবার নিয়ে কাটাতে পেরে অনেকেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে এসে অনেকে বিজ্ঞানভিত্তিক বিনোদনের সাথে যুক্ত করছেন নিজেদের ঈদের আনন্দ।
এ ছাড়া যারা কোলাহল এড়িয়ে একটু শান্তিতে সময় কাটাতে চেয়েছেন, তাদের প্রথম পছন্দ ছিল ধানমন্ডি লেক ও রমনা পার্ক। লেকের পাড়ে বসে গল্প করা কিংবা ছায়াশীতল পরিবেশে পায়চারি করে সময় কাটিয়েছেন তারা। রমনা পার্কে ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি।
হাতিরঝিলের ওয়াকওয়ে ও লেকপাড়েও ছিল উপচে পড়া ভিড়। কড়া নিরাপত্তার মাঝে লেকে ওয়াটার ট্যাক্সিতে ভ্রমণ ছিল দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অন্য দিকে, আধুনিক ঢাকার প্রতীক ‘ মেট্রোরেল’ ভ্রমণেও ছিল উৎসবের আমেজ। উত্তরা উত্তর, আগারগাঁও ও মতিঝিল স্টেশনে দিনভর যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বাইরে বিভিন্ন এলাকার ছোট ছোট পার্ক ও খেলার মাঠেও মানুষের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান আর শিশুদের নাগরদোলার শব্দে মুখরিত ছিল এই চত্বরগুলো।



