বহুমাত্রিক লড়াইয়ে রংপুর বিভাগের সংসদীয় আসনগুলোতে এবার ‘ভিআইপি প্রার্থীদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্বাচনে আবির্ভূত নতুন প্রার্থীরা’। এই তালিকায় আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জি এম কাদের, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ব্যারিস্টার তাসভীর উল ইসলাম, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আখতার হোসেনসহ বেশ কয়েকনজন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলছে, ‘বিশেষ করে বিভাগের অন্তত ১২টি আসনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি (জাপা) ও জোটভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ বা ‘ভিআইপি’ প্রার্থীরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন প্রার্থী ও বদলে যাওয়া ভোটারদের মানসিকতার কারণে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও ভোটারদের অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠেছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে। পূর্বের নির্বাচনগুলোতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনী মাঠে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও এবার মাঠে এসেছেন জামায়াতের নতুন মুখ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন। স্থানীয় পর্যায়ে তার সক্রিয় প্রচারণা ভোটের সমীকরণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। আসনটি অতীতে জোটগত সমঝোতায় জামায়াতের জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। এবার সেই জামায়াতের সাবেক জেলা আমির আনোয়ারুল ইসলাম সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। ফলে ভোটের মাঠে জোট-সমীকরণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দিনাজপুর-৩ আসনে বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থী হয়েছেন। তিনবারের পৌর মেয়র হলেও তিনি নির্ভার নন। জেলা জামায়াতের শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট ময়নুল ইসলাম তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সক্রিয়।
পঞ্চগড়-১ আসনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জমির উদ্দির সরকারের পুত্র বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির প্রার্থী হয়েছেন। তাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখপাত্র সারজিস আলম।
পঞ্চগড়-২ আসনেও বিএনপির পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন আজাদও নির্ভার নন। তার সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে রয়েছেন জামায়াতের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সফিউল আলম।
রংপুর-৩ আসন দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এবার জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হচ্ছে।
একইভাবে রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের বিপরীতে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
গাইবান্ধা-১ আসনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান। পাশাপাশি দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আসনটি তার জন্য আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাইবান্ধা-৫ আসনেও একাধিক বিদ্রোহী ও শক্ত প্রার্থীর কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুমুখী রূপ নিয়েছে।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা তাসভীর উল ইসলামও চ্যালেঞ্জের মুখে। এখানে জামায়াতের ফরেন পলিসি সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহীর সাথে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুর বিপরীতে জামায়াতের অ্যাডভোকেট আবু তাহের নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তিনিও এবারের নির্বাচনের নুতন মুখ।
লালমনিরহাট-২ আসনে জনতার দলের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) শামীম কামাল প্রার্থী হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতারা।
নীলফামারী-১ আসনে জোটপ্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটাররা এখন আগের মতো একমুখী নন। তারা প্রার্থী বাছাইয়ে উন্নয়ন, জবাবদিহি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শীর্ষ নেতারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তার মতে, এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে পারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে ২৯টি রাজনৈতিক দলের ২৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৩ জন এবং নারী প্রার্থী ৮ জন। মোট ভোটার সংখ্যা এক কোটি ৪০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৯ জন। পুরুষ ভোটার ৬৯ লাখ ৯৯ হাজার ১৩০ জন, নারী ভোটার ৭০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮৭ জন এবং ট্রান্সজেন্ডার ভোটার ১৩২ জন।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম জানান, বিভাগে মোট ভোটকেন্দ্র চার হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে ৮২৭টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, এক হাজার ৭৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং এক হাজার ৯৮৫টি সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রশাসন আশা করছে, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারবেন।



