খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যভাগ থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ। দেশে প্রকৌশল শিক্ষায় বুয়েটের পরে কুয়েটের অবস্থান। তবু শিক্ষায়তনটি চালুর কোনো উদ্যোগ এখনো ফলপ্রসূ হয়নি। এখন সেখানে স্বার্থশিকারি কয়েক পক্ষ জড়িত হয়ে পড়ায় সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে। এমতাবস্থায় কুয়েটের শিক্ষক, ছাত্র এবং কর্মকর্তা কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছেন।
কুয়েটের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ, জড়িতদের পরিচয় এবং অচলায়তন ভাঙার সম্ভাবনা সম্পর্কে ক্যাম্পাসে গিয়ে জানার চেষ্টা করা হয়। এখন দৃশ্যত ১৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় প্রকৃত জড়িত এবং ভিসিসহ শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলাসহ নানাভাবে হেনস্তা করার জন্যে দায়ী ছাত্রদের শাস্তি দেয়ার দাবিতে শিক্ষকদের ক্লাস নিতে অস্বীকৃতির কারণে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।
কুয়েটের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, আমরা ছাত্রদল, বহিরাগত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের মারামারির কথাই কেবল বলছি ও শুনছি। কিন্তু ঘটনা মারাত্মক পর্যায়ে নেয়ার জন্য দায়ী আসল কালপ্রিটদের কথা কেউ বলছে না। সূত্রগুলো জানায়, ছাত্রদলের হয়ে বিএনপির ৩১ দফার বুকলেট বিতরণ কেন্দ্র করে ঝামেলা শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধীরা ক্যাম্পাসে তাদের রাজত্বে অন্য কাউকে ভাগ বসাতে দিতে রাজি ছিল না। তারা কুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সিদ্ধান্তকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। সেই সাথে তাদের আহ্বানে হোক অথবা ৫ আগস্টে পরাজিত ছাত্রলীগের চিহ্নিহ্নত ছেলেরা খুব দ্রুতই এসে ঘটনায় জড়িয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছাত্রলীগের গ্রুপটাই মেইন গেটে বাইরের হামলা হয়েছে বলে ভিসিকে সেখানে নিয়ে গিয়ে লাঞ্ছিত করে। ভিসি আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ও ছাত্রলীগের ছেলেদের বিরুদ্ধে সঠিকভাবেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। লীগের ওরা এভবে তার প্রতিশোধ নেয়। এমনকি ভিসি সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে ভর্তি করা হয়। তাকে যে রুমে রাখা হয় ওই ছাত্ররা গিয়ে সে রুমে তালা দিয়ে বলে, শালা মরুক। আরো কয়েকজন শিক্ষককে সেখানে নিয়ে তাদের হাতে লাঠি দিয়ে মারামারি করতে বলে এবং লাঞ্ছিত করে। খুলনার রাজনৈতিক নেতারা ঘটনার এ নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিহ্নত না করেই খুব দ্রুত বলির পাঁঠা খোঁজেন। এক পক্ষ ঘটনার জন্য ছাত্রশিবির এবং অন্য পক্ষ যুবদল-ছাত্রদলকে দোষারোপ করতে থাকে। ভার্সিটির তদন্ত রিপোর্টে এসব ঘটনাই উঠে আসে এবং যেসব ছাত্রকে শাস্তি দেয়ার সুপারিশ করা হয় তাদের প্রায় সবাই লীগের কর্মী ও দোষী। বৈষম্যবিরোধীরা তাদের রক্ষার চেষ্টা কেন করছে, তা রহস্যজনক বটে, সূত্রগুলোর মন্তব্য।
সূত্রগুলো জানায়, পরবর্তী সময়ে ঘটনাপ্রবাহে স্থানীয় রাজনীতিক এবং অন্য অ্যাক্টররা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এসে জড়িত হয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের এ গ্রুপটি চাতুর্যের সাথেই ক্যাম্পাস অশান্ত রাখার উদ্দেশ্যে কাজ চালিয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধীরা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ আন্দোলন দীর্ঘ হওয়ার সুযোগ নেন। এর মধ্যেই হলগুলোর ডাইনিংয়ের প্রতিদিনের কেনাকাটার হাত বদল হয়। একজন ভিসিকে ভার্সিটির রিপেয়ার কাজের একটি টেন্ডার তাকে দিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। ভিসি বিধি ভেঙে কিছু করবেন না বলে জানিয়ে দেন। এ ছাড়া প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য ৫৭ ছাত্রের তালিকা ভিসিকে দেয় ছাত্রদের একটি পক্ষ ভর্তি করে নেয়ার জন্য। স্বাভাবিকভাবে ভিসি না বলেন। মোটা দাগে এ দুই ঘটনা ভিসি অপসারণের এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়, প্রকাশ্যে কারণ যা-ই বলা হোক। এসব পক্ষের পরিচয় জানাতে কোনো সূত্রই অবশ্য রাজি হয়নি।
যা হোক ভিসিকে অপসারণ করে সমস্যা সুরাহা করার সিন্ধান্ত নেয়া হয়। ভিসির অপসারণের পর এনসিপির এক নেত্রী ঢাকা থেকে কুয়েট ক্যাম্পাসে এসে কিছু শিক্ষার্থীকে নিয়ে নেচে-গেয়ে তা উদযাপন করেন। তাদের ভাষায় সে উদযাপন ছিল ‘বুনো’ ও দৃষ্টিকটু। মে মাসে ভারপ্রাপ্ত ভিসি হিসেবে ড. হযরত আলী দায়িত্ব নেন। তিনি ক্যাম্পাসে এসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের হাতে ফুল নেন। শিক্ষকদের সহযোগিতা নেয়ার তেমন প্রয়োজন বোধ করেননি। অন্য দিকে আওয়ামী লীগ আমলে ভিসির পদ দখল করে কুয়েটের সমূহ সর্বনাশকারী এবং ক্যাম্পাসকে বিরোধী মতের ছাত্রদের জন্যে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করার জন্য দায়ী ড. আলমগীরের আটকে দেয়া বেতনাদি প্রদানের উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কাদের তদবির ছিল তা সহজেই অনুমেয়। ফলে তিনি দ্রুতই ক্যাম্পাসে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন। সেই সাথে স্বার্থান্বেষী গ্রুপগুলোর নানা চাপ আসতে থাকে। সুতরাং পদত্যাগ ছাড়া তার আর উপায় ছিল না।
এখন কুয়েট স্বাভাবিক নিয়মে যাতে চলে সে ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথম বর্ষে যে এক হাজার ৬৫ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ক্যাম্পাসের অনিশ্চতায় তারা সবাই অন্যত্র চলে গেছে। অন্যান্যবারেও ছাত্রদের একটা অংশ চলে যায়; কিন্তু এবারেরটা বিপজ্জনক। এ জন্য প্রথমেই ভিসি নিয়োগ জরুরি। সিনিয়র শিক্ষকদের এ নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে তারা বলেন, বর্তমান সমস্যা যারা আদ্যোপান্ত জানেন-বোঝেন এবং আশপাশের জড়িত পক্ষগুলোর সাথে এনগেজমেন্টে যেতে পারবেন কুয়েটের শিক্ষকদের ভেতরের এমন কাউকে দায়িত্ব দেয়া উচিত। অবশ্য এখন কেউ ভিসি হতে চান না। কারণ সে দায়িত্বের জন্য আতিরিক্ত কোনো অ্যালাউন্স দেয়া হয় না, নিজের বেতন থেকে ২৫/৩০ হাজার টাকা এক্সট্রা ব্যয় করতে হবে। সেই সাথে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শক্ত হাতে সমগ্র পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করতে হবে। রাজনৈতিক মহলকেও ইতিবাচক থাকতে হবে।



