ঠিকাদারি দ্বন্দ্বে আড়াই বছরেও অসমাপ্ত পায়রা সংরক্ষণ প্রকল্প

ভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার

Printed Edition
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার বাহেরচর এলাকায় পায়রা নদীর তীর ভাঙনের দৃশ্য 	: নয়া দিগন্ত
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার বাহেরচর এলাকায় পায়রা নদীর তীর ভাঙনের দৃশ্য : নয়া দিগন্ত

মাহমুদ হাসান পটুয়াখালী

পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলায় পায়রা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও কৃষিজমি। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নেয়া জরুরি সংরক্ষণ প্রকল্প নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও আড়াই বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। ঠিকাদারি জটিলতায় কাজ থমকে থাকায় নদীতীরের মানুষ দিন দিন আরো অসহায় হয়ে পড়েছেন। গত এক বছরে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে সরকারি আবাসন কিংবা রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আগের বছরগুলোতে একই পরিণতির শিকার হয়েছে আরো দুই শতাধিক পরিবার।

গত ১৫ জুন উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীব্র ভাঙনে গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর কিনারায় টিকে থাকা অনেক বসতঘরও দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছেন মালিকরা। ভাঙা ঘরের টিন, বাঁশ ও অন্যান্য মালামাল দিয়ে রাস্তার পাশে পরিবার নিয়ে অনেকেই অস্থায়ী আশ্রয় গড়ে তুলেছেন।

কথা হয় ভাঙনের শিকার হয়ে সরকারি আবাসনে আশ্রয় নেয়া মোছা: লাভলী বেগমের (৩৫) সাথে। ক্যান্সারে স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় নদীতে বিলীন হয়ে যায় তার একমাত্র বসতঘরটি। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এই আশ্রয়কেন্দ্রে এসে।

একই আবাসনে থাকা রুবেল হাওলাদার জানান, ২০২১ সালে নদীতে ঘর হারানোর পর থেকেই তিনি পরিবার নিয়ে সরকারি আবাসনে বসবাস করছেন। ট্রলারচালক অলিউল্লাহ গত বছর বর্ষায় ঘর হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

শতবর্ষী দলিল উদ্দিন ফকিরের অবস্থাও একই রকম। গত বছরের অক্টোবরে তার বসতভিটা নদীতে বিলীন হওয়ার পর পরিবার নিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছেন। ট্রলারশ্রমিক জাকির হোসেন দুই বছরে দু’বার ঘর হারিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন করে জমি কেনা বা ঘর তোলার সামর্থ্য নেই তার। তাই রাস্তার পাশে একটি ঝুপড়ি তুলে কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

আঙ্গারিয়া বাজারের পান-সুপারি ব্যবসায়ী বিনয় চন্দ্র পাইকের পৈতৃক ভিটাও গত অক্টোবরে নদীতে চলে যায়। এর আগে তিনবার ভাঙনের শিকার হওয়ার পর এবার তিনি অর্থসঙ্কটে পরিবার নিয়ে বাজারে ভাড়া বাসায় উঠতে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো নদী সংরক্ষণ কাজ শেষ হলে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না তার। সাবেক ইউপি সদস্য কবীর সিকদার বলেন, ২০২৪ সালের জুনে ভাঙনরোধে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে জিওব্যাগগুলো নদীতীরে ফেলে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো স্থাপন করা হয়নি।

তার দাবি, গত পাঁচ বছরে বাহেরচর এলাকায় প্রায় ৫০০ একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ পরিবার।

কবীর সিকদার আরো বলেন, ভাঙন অব্যাহত থাকলে চলতি বর্ষায় বাহেরচর বাজার, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দু’টি মসজিদ ও একটি মাদরাসা হুমকির মুখে পড়বে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাহেরচর এলাকায় পায়রা নদীর ভাঙনরোধে জরুরি সংস্কার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রায় তিন কোটি ৯৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ পায় ‘শহিদ-খুশি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এক বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ২৬ মাস অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো অসমাপ্তই রয়ে গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙনকবলিত প্রায় ৫০০ মিটার এলাকাজুড়ে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় অনেক জিওব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। ব্যাগগুলো এভাবে ফেলে রাখায় এখন সেগুলো ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় নেই।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রাকিব বলেন, মূল ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে আছে। একাধিকবার নোটিশ দিয়েও কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, আগের ঠিকাদারের সাথে চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নতুন দরপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরো সময় লাগবে। এর মধ্যে পায়রা নদীর ভাঙনে আর কত পরিবার সর্বস্ব হারাবে, সেই উদ্বেগই এখন সবচেয়ে বেশি।