শওকত এয়াকুব
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হুঙ্কার দিয়েই কাব্যপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলেন। তাই নজরুল বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি বলে খ্যাত। দুরারোগ্য ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় দেহে বেঁচে থাকলেও মন বেঁচেছিল না। বাঙালি জাতির এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য কী হতে পারে? আজ নজরুল নেই, কিন্তু তার কাব্য ও গানের উত্তাপ এখনো অনুভূত হয় সব খানে।
নজরুল প্রথম বিয়ে করেন বাংলা ১৩২৮ সালের ৩ আষাঢ়। কুমিল্লার দৌলতপুরের আলী আকবর খানের বিধবা বোনের মেয়ে সৈয়দা খাতুন ছিলেন পাত্রী। এই সৈয়দা খাতুনই পরবর্তীকালে নার্গিস খানম হয়ে যান। নার্গিস খুব সুন্দরী ছিলেন। কাবিননামায় লেখা হয়- কাজী নজরুল ইসলামকে দৌলতপুর এসে নার্গিস বেগমের সাথে বসবাস করতে হবে। নার্গিস বেগমকে নজরুল অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। কথাগুলো মেনে নিতে নজরুলের পৌরুষে বাধে। তিনি তখন ক্রুদ্ধ হয়ে কাবিননামায় দস্তখত না করেই দৌলতপুর থেকে কুমিল্লা চলে আসেন। এরপর নজরুল আর নার্গিসের কাছে যাননি। তাই নার্গিসের সাথে কবির ঘর-সংসার করাও হয়নি।
সেজন্য বলা যায়, নজরুলের এই বিয়েটা নামেই বিয়ে। নজরুলের দ্বিতীয় বিয়ে হয় ২৪ এপ্রিল ১৯২৪। কনে কুমিল্লার এক বৈদ্য পরিবারের মেয়ে। নাম আশালতা সেনগুপ্ত। আশালতা বিধবা গিরিবালা দেবীর কন্যা। আশালতার অন্য নাম প্রমীলা। পাত্র মুসলমান, পাত্রী হিন্দু। প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত হতে হয়নি। বিয়ে হয় এন্টালির ৬ নম্বর হাজি লেনে। পরের বছর জন্মাষ্টমীর দিন তাদের একটি পুত্রসন্তান হয়। নাম কৃষ্ণ মহম্মদ। শৈশবেই তার মৃত্যু হয়।
দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় ৯ অক্টোবর, ১৯২৬। নাম বুলবুল। কবি জসীম উদ্দীন বুলবুলের বিষয়ে লিখেছেন, অতটুকু ছেলে কী সুন্দর গান গাইতে পারত। কী মিষ্টি সুরে কথা বলত। কবির কোল থেকে কেড়ে নিয়ে আমরা তার মিষ্টি কথা শুনতাম। কবি হারমোনিয়ামে যখন যে সুর বাজাতেন বুলবুল শুনেই বলতে পারত কোন সুর কবি বাজাচ্ছেন। ওস্তাদি গানের নানা সুর-বিভাগের সাথে ওই বয়সেই সে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের বাসায় হঠাৎ বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে বুলবুলের মৃত্যু হয়। সে দিনটি ছিল ৭ মে ১৯৩০। বয়স হয়েছিল মাত্র চার বছর। বুলবুল ছিল কবির নয়নমণি। জসীম উদ্দীন লিখেছেন, কবি বুলবুলকে নিয়ে বড় বড় মজলিসে যেতেন। এই শিশুটিকে বুলবুলের মৃত্যুর সময় জসীম উদ্দীন কলকাতা ছিলেন না। কলকাতা এসে তিনি শোকাতুর কবির ছন্নছাড়া জীবন কতকটা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে উঠছিল। কবি আর কবিপতœীকে অনন্ত কান্নার সাগরে ডুবিয়ে সেই বুলবুল পাখি বেহেস্তে উড়ে গেল।
নজরুলের তৃতীয় সন্তান কাজী সব্যসাচী। ডাক নাম সানি। জন্ম ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। সব্যসাচী সাহিত্যানুরাগী। তিনি ভালো আবৃত্তি করতেন। তার স্ত্রীর নাম উমা। তাদের দুই মেয়ে, এক ছেলে। তাদের নাম খিলখিল কাজী, মিষ্টি কাজী ও বাবুল কাজী। মিষ্টি কাজীর তিন সন্তান- দুর্জয়, স্নেহা ও সুইটি। বাবুল কাজীর দুই সন্তান-আহলাদ ও সাজওয়াদ।
সব্যসাচী পিতা নজরুলের মতো উদার ছিলেন। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। নজরুলের চতুর্থ পুত্র অনিরুদ্ধ কাজী। ডাকনাম নিনি। জন্ম ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ভালো গিটারবাদক ছিলেন। সুরকার হিসেবেও তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তিনি স্বরলিপিসহ নজরুলের গজল ও ভক্তিগীতি কয়েকটি গ্রন্থে প্রকাশ করেন।
কলকাতার ‘সাহিত্যম’গ্রন্থগুলোর পরিবেশক। তিনি বেশকিছু প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন। ‘নজরুলগীতি’ প্রবন্ধে অনিরুদ্ধ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল মার্গ সঙ্গীতের গণ্ডিতে বন্ধ থাকলে বাংলাগান প্রাণ পাবে না। তাই তিনি একদিকে কথায় কাব্য-সঙ্গীতের ধারা এবং অপর দিকে দেশী ও বিদেশী সূরের উদার অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে বাংলা গানের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তকে মেলে ধরেছেন। নজরুল সেই ধারাকে আরো অনেক দূরে ও বিচিত্র পথে টেনে নিয়ে যান।
অনিরুদ্ধ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তার স্ত্রীর নাম কল্যাণী কাজী। অনিরুদ্ধ দুই পুত্র ও এক কন্যা রেখে যান। তারা হলেন অনির্বাণ কাজী, অরিন্দম কাজী ও অনিন্দিতা কাজী। অনির্বাণ কাজীর সন্তান- অঙ্কন ও ঐশ্বর্য। অরিন্দম কাজীর সন্তান অভীপ্সা ও অনুরাগ। নজরুলের নাতি-নাতনী খিলখিল কাজী, মিষ্টি কাজী, বাবুল কাজী, অনির্বাণ কাজী, অরিন্দম কাজী, অনিন্দিতা কাজী এবং তাদের সন্তান-দুর্জয়, স্নেহা, সুইটি, আহনাফ, সাজওয়াদ, অঙ্কন, ঐশ্বর্য, অভীপ্সা ও অনুরাগ- কবি দীর্ঘকাল জীবস্মৃত অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। এই সময় পুত্র সব্যসাচী, অনিরুদ্ধ এবং পুত্রবধূ উমা ও কল্যাণী কবির খুব সেবাযতœ করেন। কবিপতœী প্রমীলা দেবীও খুব অসুস্থ ছিলেন। পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর লেখা থেকে জানা যায়, নাতি-নাতনীরা ছিল তার নয়নমণি। অনির্বাণ কাজী ও খিলখিল কাজীর যখন জন্ম হয়, তখন আনন্দে তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয় খিলখিল ভালো গাইতে পারেন। পৌত্র অনির্বাণ কাজী ‘আমার ঠাকুর্দা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, তখন আমার সবে জ্ঞান হয়েছে। থাকি পাইকপাড়ার বাড়িতে। দেখতাম একজন মানুষকে চুপচাপ খাটে বসে থাকতে, আবার কখনো বা সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে।...আমি জানতাম এই আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তখনো বুঝতে পারতাম না দলে দলে লোকেরা কেন এসে আমার দাদুকে ফুলের মালা পরিয়ে দিতেন বা রজনীগন্ধার গুচ্ছ তার হাতে তুলে দিয়ে পায়ের ধুলো নিয়ে ধন্য হতেন। তারপর বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপলব্ধি করলাম যে বিরাট এক প্রতিভার ছত্রচ্ছায়ায় আমার জন্ম হয়েছে।
প্রথমে প্রমীলা দেবীর মৃত্যু হয়। তারপর ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ ঢাকায় রোববার সকাল ১০টায় নজরুলের জীবনদীপ নির্বাপিত হয়। কাজী সব্যসাচী ঢাকার সমাধিস্থলের মাটি এনে চুরুলিয়ায় মায়ের পাশে সমাধি দেন। প্রমীলা দেবী- যার জন্ম কুমিল্লা গোমতী নদীর তীরে। তিনি এলেন অজয় নদীর ধারে। আর কবি নজরুল যার জন্ম হয় অজয়ের দেশে তিনি চিরশায়িত আছেন বুড়িগঙ্গার কূলে। নজরুল-প্রমীলার সন্তানগণ পশ্চিমবঙ্গে চিরনিদ্রিত।



