ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্ব ফুটবলের ২৩তম আসরে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই। অন্যতম আকর্ষণীয় এই লড়াইয়ে আজ হচ্ছে ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’। মুখোমুখি লড়াইয়ে মাঠে নামছে একই উপদ্বীপের দুই পরাশক্তি স্পেন ও পর্তুগাল। এই দ্বৈরথ শুধু পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার লড়াই নয়, এটি মর্যাদা, ঐতিহ্য এবং আধিপত্যেরও লড়াই। দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল, বল দখলে আধিপত্য এবং তারকাখচিত স্কোয়াডের জন্য পরিচিত। ফলে সমর্থকদের প্রত্যাশা, মাঠে দেখা যাবে উচ্চমানের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে শুরু হবে এই ম্যাচটি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের খেলার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্পেন। একসময় শুধুই টিকি-টাকা ফুটবলের জন্য পরিচিত দলটি এখন দ্রুতগতির আক্রমণ, উইং ব্যবহার এবং উচ্চ প্রেসিংয়ের ওপরও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সমন্বয়ে গড়া দলটি মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সক্ষম। তাদের পাসিংয়ের নিখুঁততা এবং সংগঠিত রক্ষণ যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্য দিকে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল পর্তুগালও। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করে আসা দেশটি এখন এমন একটি স্কোয়াড গড়েছে, যেখানে প্রতিটি পজিশনে রয়েছে মানসম্পন্ন খেলোয়াড়। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক, ডান ও বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং দূরপাল্লার শট বড় শক্তি পর্তুগিজদের। দলটির আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়েছে মাঝমাঠে সৃজনশীলতা এবং রক্ষণে দৃঢ়তা।
স্পেনের আক্রমণের অন্যতম ভরসা হবে তাদের তরুণ উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল। যারা একের বিপরীতে একজনকে কাটিয়ে সুযোগ তৈরি করতে পারদর্শী। মাঝমাঠের ফুটবলাররা ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি সেট-পিস থেকেও তারা গোলের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাইবে।
স্পেনের লামিন ইয়ামাল, পোরো, দানি ওলমো বা আইমেরিক লাপোর্তে কেউই গত শুক্রবার পুরোপুরি অনুশীলন করেননি। তবে তাদের কারোরই কোনো গুরুতর সমস্যা নেই; বরং তাদের কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। ইয়েরেমি পিনো (কাঁধ) এবং নিকো উইলিয়ামসের (অ্যাডডাক্টর) শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলতে না পারার সম্ভাবনা রয়েছে। দে লা ফুয়েন্তে যদি পোরোকে খেলানোর ঝুঁঁকি না নেন, তবে মার্কোস লরেন্তে তার একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারেন; কিন্তু অপরিবর্তিত রোজা একাদশই মাঠে নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১০ সালের ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার একমাত্র গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করেছিল স্পেন। এরপর থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ জিততে পারেনি লা রোজারা। এবার নিজেদের নকআউট পর্বের ভুল শুধরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়টি ছিল বিশ্বকাপে তাদের প্রথম গ্রুপ পর্বের বাইরের জয়। এবারের আসরে দলটির গোল করার সেরা কারিগর মিকেল ওয়ায়ারজাবাল। তারা করা দু’টি ও পেদ্রো পোরোর এক গোলের সুবাদে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা। এই তিন গোলের জয় ১৯৯৪ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে তাদের একাধিক গোল করার গৌরব এনে দেয়।
বিশ্বকাপে টানা তিন ম্যাচে জয়ী স্পেনের রক্ষণভাগ অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রমণভাগের চেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে। কারণ দে লা ফুয়েন্তের দল সহ-আয়োজক মেক্সিকোর সাথে এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম না করা দু’টি দলের একটি। তা ছাড়া ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা শেষ-৩২-এর ম্যাচে একটিও টার্গেট শটের সম্মুখীন হয়নি। যা ২০১৪ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম জার্মানির পর বিশ্বকাপের কোনো নকআউট খেলায় এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।
পর্তুগালের শক্তি মূলত তাদের ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড। অভিজ্ঞ ফুটবলারদের পাশাপাশি তরুণদের গতিও রয়েছে দলে। আক্রমণে তারা দ্রুত ট্রানজিশনের মাধ্যমে স্পেনের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে চাইবে। বিশেষ করে উইং থেকে ক্রস এবং বক্সের বাইরে থেকে শট নেয়ার প্রবণতা স্পেনের জন্য বাড়তি সতর্কতার বিষয় হবে।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে লুকা মডরিচের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে বিশ্বকাপে টিকে রইল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোররা। শেষ ষোলোতে পৌঁছে ৬০ বছরের ইতিহাস মুছে দিয়েছে; উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপে পিছিয়ে থেকেও একটি ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শেষ ষোলোর অভিশাপ তাড়া করে ফিরছে পর্তুগালকে।
২০১০ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ অভিযান এই পর্যায়েই শেষ হয়েছিল পর্তুগালের। যেমনটা হয়েছিল তাদের ইউরো ২০২০-এর যাত্রাও। এরপর ২০২২ সালের মুন্ডিয়াল এবং ২০২৪ সালের মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তারা টানা দুইবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়।
শেষ ষোলোর জন্য সম্পূর্ণ ফিট একটি দল পর্তুগাল। ফলে কোচ মার্টিনেজ জয়ের কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনবেন বলে আশা করা যায় না। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর জয়ে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোকে বদলি করা হলেও স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে একাদশে থাকার সম্ভাবনা বেশি। আল নাসরের এই তারকা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার প্রথম গোলটি করার পর দলের জয় নিশ্চিত করেন গঞ্জালো রামোস। এসি মিলানের এই নতুন খেলোয়াড় বিশ্বকাপে প্রতি ৩৭ মিনিটে গড়ে একটি গোল বা অ্যাসিস্ট করেছেন। যা পাঁচ বা তার বেশি ম্যাচে জড়িত থাকা পর্তুগালের যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সেরা অনুপাত। কিন্তু তাকে আবারো একজন সুপার সাবের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। ডানপ্রান্তে পেদ্রো নেতোকে প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে বার্নার্দো সিলভা ও ফ্রান্সিসকো কনসেইকাওয়ের সাথে।
ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হবে মাঝমাঠের লড়াই। পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে দুই দলের রক্ষণভাগকেও। স্পেনের ডিফেন্ডারদের পর্তুগালের দ্রুতগতির আক্রমণ সামলাতে হবে, আবার পর্তুগালের রক্ষণকে স্পেনের ধারাবাহিক পাসিং ও পজিশনাল আক্রমণ ঠেকাতে হবে। তবে অতীত পরিসংখ্যানে এগিয়ে স্পেন। এখন পর্যন্ত দুই দলের ৪১ বার মুখোমুখি লড়াইয়ে ১৮ বার জয় স্পেনের। অপর দিকে ৭টি ম্যাচে জয় পেয়েছে পর্তুগাল। বাকি ১৬টি ম্যাচ হয়েছে। ড্র। তবে সবশেষ গত বছর ৮ জুন উয়েফা নেশন্স লিগে দল দু’টি ২-২ গোলে ড্র করার পর টাইব্রেকারে স্পেনকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল পর্তুগাল।



