আবদুল কাইয়ুম
- অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আ’লীগ
- লক্ষ্য অর্জনে আইনশৃঙ্খলার অবনতি করার চেষ্টা
সামাজিক অস্থিরতা, জঘন্য অপরাধ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংবেদনশীল ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে এক ভয়াবহ হাইপ বা গুজব তৈরি করে আইনশৃঙ্খলাকে বিঘিœত করার অপচেষ্টা চলছে। সাধারণ অপরাধ বা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কৃত্রিম অবনতি ঘটে। গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বিভিন্ন সময়ের সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনাকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ও তাদের স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছে, তাই দেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সাম্প্রদায়িক বা মব-উসকানি দিয়ে দেশে এক ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করতে চায় এমন কিছু আওয়ামী লীগের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপ। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্পকে অস্থির করে তুলতে দেশী-বিদেশী একদল ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক উসকানিদাতা সক্রিয় রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই অস্থিরতা তৈরিতে দেশ ও বিদেশ উভয় সূত্র থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছড়ানো হচ্ছে। বিদেশে পলাতক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের ব্যক্তিরা হুন্ডি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াতে এবং পুরনো বা ভুয়া ভিডিও এডিট করে সঙ্ঘাত উসকে দিতে পেইড সাইবার ট্রল আর্মিকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন-গ্রাউন্ডে অপরাধীদের টাকা দিয়ে কৃত্রিমভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করানো হচ্ছে।
সম্প্রতি পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে তার প্রতিবেশী ফুসলিয়ে ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে নৃশংসভাবে হত্যা ও শির-েদ করে। আওয়ামী লীগ ও তাদের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাটিকে হাতিয়ার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে যে, দেশে আইনশৃঙ্খলার অস্তিত্ব নেই। তারা ঘটনাটিকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়ার চেষ্টা চালায়।
চলতি মাসের শুরুতে পুলিশের শীর্ষস্থানীয় বিতর্কিত ১৬ জন ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সাথে দেশজুড়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং লুণ্ঠিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়। আওয়ামী পন্থী ও সুবিধাভোগী মহলের পেইড সাইবার ট্রল আর্মি এই রদবদলকে প্রশাসনিক ভাঙন ও পুলিশের কর্মবিরতি হিসেবে অনলাইনে প্রচার করে সাধারণ অপরাধীদের ডাকাতি, ছিনতাই ও বিশৃঙ্খলা করতে উসকে দেয়। এ দিকে ইউনিফর্ম পরিবর্তনের মতো বড় সংস্কারের সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক দেখলেও এর টাইমিং নিয়ে কথা বলেছেন।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং হামের প্রাদুর্ভাবে ৫০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যুকে পুঁজি করে একটি চক্র হাসপাতালগুলোতে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, যাতে সরকারের চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যর্থ প্রমাণ করা যায়। এ ছাড়া ছিনতাই, চুরি ও হত্যার ঘটনা সাধারণত পুলিশিং ব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে সাময়িক বৃদ্ধি পেলেও, পুরনো কিছু ডাকাতির ভিডিও এবং সিসিটিভি ফুটেজ এডিট করে এমনভাবে প্রচার করে যেন পুরো দেশ অপরাধীদের দখলে চলে গেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেভাবে ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতে হামলা একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নাশকতা। তা ছাড়া পুলিশের শীর্ষ পদে বড় রদবদলের কারণে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। যৌথ বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পুলিশের চেইন অব কমান্ড দ্রুত শক্ত করা এবং মাঠ পর্যায়ের কনস্টেবলদের মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ক্ষমতাচ্যুত অপশক্তি অন-গ্রাউন্ডে সুবিধা করতে না পেরে এখন সাইবার স্পেসকে হাতিয়ার করেছে। পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় যেখানে প্রশাসন মাত্র পাঁচ দিনে চার্জশিট দিয়ে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাল, সেখানেও অনলাইনে নেতিবাচক হাইপ তৈরি করা হচ্ছে। সরকারের উচিত প্রতিটি সফল অ্যাকশনের গল্প বা সত্য তথ্য দ্রুত জনগণের সামনে প্রচার করা।
অন্য দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুসলিম পরিবারগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে পশুবলি ও কোরবানি সংক্রান্ত কিছু আইনি নোটিফিকেশন জারি করা হয়, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বার্থান্বেষী মহল বিষয়টিকে মুসলিমদের কোরবানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে প্রচার করে ধর্মীয় দাঙ্গা বা উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
এ ছাড়াও অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে বিএসএফের কঠোর অবস্থানের কারণে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশে এই গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে দলে দলে মুসলিমদের পুশইন বা বাংলাদেশে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই কৃত্রিম হাইপ তৈরি করে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ভারতবিরোধী ক্ষোভ উসকে দেয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং কোরবানির আইনি কড়াকড়ি সম্পূর্ণ ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং আইনি বিষয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে ওঁৎ পেতে থাকা স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় রঙের ‘হাইপ’ দিচ্ছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ইমোশনকে ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অস্থিরতা তৈরি করা।
অপরাধ বিজ্ঞানী ও সমাজ গবেষক ড. এম এ জলিল বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী কোরবানি সংক্রান্ত আইনি রায়কে যেভাবে ধর্মীয় উসকানি হিসেবে বাংলাদেশে ছড়ানো হচ্ছে, তা চরম বিপজ্জনক। সাধারণ মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের প্রবণতা কম থাকায় এই স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে দেশে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে। এর জন্য ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো জরুরি।
গোয়েন্দার তথ্যমতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত আধুনিক অস্ত্র ও আড়াই লাখেরও বেশি গোলাবারুদ এখনো অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। স্বার্থান্বেষী মহল এই অস্ত্রধারী পেশাদার অপরাধীদের টাকা দিয়ে ভাড়া করে বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম ছিনতাই বা ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে, যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১০ গুণ বাড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং গুজব রটনাকারীদের ডিজিটাল ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশের ১৬ জন ডিআইজি-কে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্যমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম উসকানি বা গুজব ছড়িয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও মাঠ পুলিশ অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। অতীতে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তবে বর্তমান পুলিশ জনগণের শত্রু নয়, বরং জনগণকে সাথে নিয়েই এই ধরনের অপচেষ্টা নস্যাৎ করা হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল (অব:) পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি খারাপ, তা কিন্তু ঠিন নয়। বরং আগের চেয়ে অপরাধের মাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে বর্তমানে ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনের পর সব ধরনের দাবি ও আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, এসব মূলত রাজনীতিবিদরা করাচ্ছে। রাইসার হত্যাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত কাজ করেছে। কিন্তু তার পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে আন্দোলন ও উত্তেজনা পরিস্থিতি তৈরি করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের দেড় বছরসহ বর্তমানেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব কাজ করে যাচ্ছে। এখন পুলিশের জন্য ভালো একটি সময় যাচ্ছে। তারা চাইলেই এই সময়ে ভেতরগত কাজ করে নিতে পারে।



