নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ আগামী ১৬ জুলাই থেকে শুরু করছে ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসব। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১২৮টি স্থানে এ উৎসব উদযাপিত হবে। ইসকন বলছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবকল্যাণ এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এ আয়োজন।
তবে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাংলাদেশে ইসকনকে ঘিরে গত কয়েক বছরে নানা বিতর্কও সামনে এসেছে। বিশেষ করে ইসকনের সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, জমি ও মন্দির পরিচালনা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সংগঠনটির সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে এবারের রথযাত্রাও ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংগঠনিক দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
যেভাবে পালিত হবে রথযাত্রা
ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ভক্তিময় নিতাই স্বামীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, বিশেষ পূজা এবং বিশ্বশান্তি, মানবকল্যাণ ও বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কামনায় প্রার্থনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে।
বিকেলে স্বামীবাগ আশ্রম থেকে রথযাত্রা বের হয়ে জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলা মোড়, পল্টন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, কাকরাইল, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় ও শাহবাগ হয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পৌঁছাবে।
২৪ জুলাই একই পথে অনুষ্ঠিত হবে উল্টো রথযাত্রা, যা স্বামীবাগ মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে।
ইসকনের দাবি, ভারতের পুরীর রথযাত্রার পর ঢাকার রথযাত্রাই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রথযাত্রা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি শতাধিক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক কাজ করবেন।
রথযাত্রার ইতিহাস ও ধর্মীয় তাৎপর্য
রথযাত্রা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা। ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দির থেকে এ উৎসবের সূচনা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে এটি পালিত হয়।
বৈষ্ণব ধর্মমতে, ভগবান জগন্নাথ বছরে একবার রথে চড়ে ভক্তদের কাছে আসেন। এটি ঈশ্বর ও ভক্তের মিলনের প্রতীক। একই সাথে এটি সামাজিক সম্প্রীতি, সেবা, দান ও ভক্তির উৎসব হিসেবেও বিবেচিত হয়। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রথযাত্রায় অংশগ্রহণের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ইসকনের ইতিহাস ও বিতর্ক
ইসকনের পূর্ণ নাম ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস। এটি ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারক এ সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে ইসকনের মন্দির, আশ্রম, শিক্ষা কার্যক্রম ও মানবিক সেবামূলক কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার আগে থেকেই সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হয় এবং বর্তমানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় তাদের মন্দির ও ধর্মীয় কেন্দ্র রয়েছে।
বাংলাদেশে ইসকনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এক দিকে, ইসকনের সমর্থকরা দাবি করেন, সংগঠনটি ধর্মীয় শিক্ষা, মানবসেবা, প্রসাদ বিতরণ, যুবসমাজের নৈতিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অন্য দিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন নেতা ও কিছু ঐতিহ্যবাহী সংগঠন অভিযোগ করে আসছেন, ইসকন অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থানকে পুরো সনাতন সমাজের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এ ছাড়া মন্দির পরিচালনা, ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং কিছু রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান নিয়েও ভিন্নমত প্রকাশ পেয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলো বিষয়ে ইসকনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান সবসময় এক নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটি বলেছে, তারা একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান এবং আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করাই তাদের লক্ষ্য।
সনাতন নেতাদের সাথে মতপার্থক্যের কারণ
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব সংগঠন বা নেতা ইসকনের বিরোধী নন। তবে কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়- সনাতন সমাজের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে; ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে; মন্দির ও ধর্মীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে; কিছু জাতীয় ইস্যুতে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণের ধরন নিয়ে এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারার বাইরে অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কের বিষয় নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো মূলত সাংগঠনিক ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক মতপার্থক্য; ধর্মীয় বিশ্বাসের মৌলিক পার্থক্য নয়।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনের প্রস্তুতি
বাংলাদেশে রথযাত্রা সাধারণত শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে বড় জনসমাগমের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। ইসকন জানিয়েছে, তাদের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা পুলিশ ও প্রশাসনকে সহায়তা করবেন, যাতে শোভাযাত্রা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রথযাত্রা ভক্তি, সেবা ও সম্প্রীতির প্রতীক। একই সাথে এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ইসকনকে ঘিরে বিদ্যমান সাংগঠনিক বিতর্কের কারণে এবারের রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবেই নয়, সনাতন সমাজের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও সংগঠনগুলোর পারস্পরিক অবস্থান পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।



