নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনের নবম দিন মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: আব্দুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কথা বলেন। এ সময় কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়াসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। গতকাল প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। নির্ধারিত প্রশ্নের লিখিত জবাব টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদ সদস্য মো: আব্দুল্লাহ্ প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে ৮ শতাংশের মধ্যে, যেখানে নেপালে এই হার প্রায় ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা ছোট অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের চাইতে অনেক বেশি। বাংলাদেশের এই সমস্যা সমাধানে কোনো পরিকল্পনা নেয়া হবে কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি মিডিয়াম অ্যান্ড লং-টার্ম রেভিনিউ স্ট্র্যাটেজি (এমএলটিআরএস) গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর-জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভাগের এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অনলাইন উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় ও কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব ব্যয় হ্রাস করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৬ প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নপূর্বক ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার যথা সম্ভব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের উত্থাপিত তারকা-চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হজের খরচ কমিয়ে তা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নাগালে আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। হজের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ আরো সাশ্রয়ী ও যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হজ একটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। এর মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ খরচ সৌদি আরব সরকার নির্ধারণ করে। মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যয় বাংলাদেশ অংশে হয়, যার বেশির ভাগই বিমান ভাড়া। সংসদকে তিনি জানান, ২০২৫ সালে সর্বনি¤œ হজ প্যাকেজ ছিল চার লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০২৬ সালে হজের খরচ ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালে সর্বনি¤œ হজ প্যাকেজ নির্ধারিত হয় চার লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা (কোরবানিসহ)।
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রেলপথে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন (বৈদ্যুতিক ট্রেন) চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরো জানান, বাংলাদেশ রেলওয়েকে জাতীয় পরিবহনব্যবস্থার মূল মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রেলসেবা দেশের প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরে পৌঁছে দিতে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে মোট ২৪টি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে। রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্রমান্বয়ে আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। স্বল্পমেয়াদে (২০২৬-২৭) আন্তঃনগর তিনটি ও কমিউটার ১০টি, মধ্য মেয়াদে (২০২৭-৩০) আন্তঃনগর ১৫টি ও কমিউটার ১৬টি এবং দীর্ঘ মেয়াদে (২০৩১-৪৫) আন্তঃনগর ১০৩টি ও কমিউটার ৮৫টি ট্রেন বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে এর দায় এবং সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণকার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকার হামের প্রাদুর্ভাব রোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: সেলিম রেজার তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষি খাতে সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি ও প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সাথে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে এ কার্যক্রম সম্পাদন করা হচ্ছে। আজ পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৩২টি কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।



