রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের আসক্তকরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিসাধনের দায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা করেছে নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত। একইসাথে বিচারক এই অর্থ রাজ্যের শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে জমা দেয়া এবং প্ল্যাটফর্ম দু’টিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়েছেন।
নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট দলীয় অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেসের দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সান্তা ফের ফার্স্ট জুডিশিয়াল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ব্রায়ান বিডশাইড এ নির্দেশ দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম নিউ মেক্সিকো রাজ্যে জনস্বার্থের জন্য চরম ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মামলার অভিযোগে তোরেস উল্লেখ করেছিলেন, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমন কৌশলে তৈরি করা হয়েছে যেন শিশুরা এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্ল্যাটফর্ম দু’টি শিশুদের যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর আগে গত মার্চে মামলার প্রথম ধাপে জুরি বোর্ড জানায়, তরুণদের নিরাপত্তা ইস্যুতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে মেটা ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে। তখন প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান আইনি লড়াইয়ের মধ্যে নিউ মেক্সিকোর এই রায়কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটির ৪০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য এবং এক হাজার ৩০০টিরও বেশি স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ একত্রে সামাজিক মাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে জনস্বার্থ বিঘিœত করার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে, যেখানে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ফিচার পরিবর্তনের মূল দাবি তোলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, মেটাকে আগামী পাঁচ বছর অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় একাধিক শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে- ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশুদের মাসিক সময়সীমা নির্ধারণ, অতিরিক্ত নোটিফিকেশন সীমিতকরণ, প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, এআই চ্যাটবটের জন্য বিশেষ সুরক্ষাবলয় এবং শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুততম সময়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা।
অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস মন্তব্য করেন, মেটা সবসময় সুরক্ষার চেয়ে বাণিজ্যিক মুনাফাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এই আদেশের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো সামাজিক মাধ্যমকে শিশুদের সুরক্ষায় নিজেদের সিস্টেমে পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতায় আনা হলো, যা অন্যান্য অঙ্গরাজ্য ও দেশের জন্যও একটি নতুন দৃষ্টান্ত। গত বছর রয়টার্সের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মেটার অভ্যন্তরীণ নথিতেই এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে শিশুদের সাথে রোমান্টিক বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদানের ঝুঁকির কথা স্বীকার করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, নিউ মেক্সিকোর কোনো শিশু যেন এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে কিংবা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি চ্যাটবট ব্যবহার করে কোনো শিশুকে ঘিরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে না জড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেটা। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা জানায়, তারা অনলাইনে কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আনা এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ক্ষতিকর কনটেন্ট চিহ্নিত ও তা অপসারণের কাজ নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, মেটার ওপর আইনি চাপ এখানেই শেষ নয়। আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে ২৯টি অঙ্গরাজ্যের যৌথ মামলায় আদালত কক্ষে হাজির হতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। সেখানে শিশুদের আসক্ত করা ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বড় অঙ্কের জরিমানা গুণতে হতে পারে। এ ছাড়া টেনেসি অঙ্গরাজ্যে দায়ের করা অপর একটি মামলার শুনানি গত জুলাই থেকে চলমান রয়েছে। পরিস্থিতি বিচারে মেটা ইতোমধ্যে তাদের বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা তাদের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



