বিএনপির অবস্থানে ক্ষুব্ধ ১১ দলের আন্দোলনের প্রস্তুতি

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানে ক্ষুব্ধ জামায়াতসহ ১১ দল। এরই মধ্যে তারা রাজপথে আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছে। তবে এখনই এমন কর্মসূচিতে যেতে চায় না দলগুলো। তারা মনে করছেন আগে সংসদে বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা বলা হবে। তাতে কাজ না হলে ক্রামন্বয়ে আন্দোলনে যাওয়া হবে। অবশ্য এরই মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী ২৪ এপ্রিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে ১১ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

গত রোববার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এ পরিষদ গঠনের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে এ বিষয়ে সরকারি দলের অবস্থান জানতে চান। অন্য দিকে সরকারি দলের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, সংবিধান অনুযায়ী সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই। গণভোটের রায় অনুসারে সেটা ধারণ করতে হলে আগে সংবিধানের সংশোধনী হতে হবে। সেটা নিয়ে সংসদে আলাপ আলোচনা হবে। সংবিধান সংশোধন হলে সে মত সেটা সংবিধানে ধারণ হবে, যদি পরিষদ হয় তারপর যদি ফর্ম হয় যদি শপথ নিতে হয় সেটা তারপরের ব্যাপার।

বিএনপির এ অবস্থানে ক্ষুব্ধ জামায়াতসহ ১১ দল। তারা মনে করছেন, বিএনপি জুলাই সনদে সই করেছে এবং বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছে। তারপর এখন ভিন্ন কথা বলছে, যাতে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। গত রোববার সংসদের বাইরেও কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনের বিষয়ে আমরা এখন নোটিশ করব। নোটিশ করে সংসদের ভেতরেই এর সমাধান করতে চাই। কিন্তু কোনো কারণে যদি সংসদে জনগণের এই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন না পাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদেরকে রাজপথে নামতে হবে।

এ বিষয়ে গতকাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি বিষয়টির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। তারা জুলাই সনদে সই এবং বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছে। তারপরও তারা এখন বাস্তবায়নে বিলম্বিত করছে। এতে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। আমাদের এমপিরা সংসদে কথা বলবেন। এরপরও কাজ না হলে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি আছে। তবে এখনই আন্দোলনে যাওয়া হচ্ছে না। এটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

গত ১৪ মার্চ বিষয়টি নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য বৈঠক করে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একই দিনে দু’টি বিষয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হয়- একটি জাতীয় সংসদ এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য। একই দিনে ভোট গ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা এবং গেজেট নোটিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। তাই জনগণের রায়ের ভিত্তিতে সরকারে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা দায়িত্ব। সংস্কার প্রক্রিয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। অথচ গণভোটে বিপুল জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের এই রায়কে উপেক্ষা করা জাতির প্রতি এক ধরনের অবমাননার শামিল। সরকার যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকে, খুব শিগগিরই শীর্ষ নেতাদের বৈঠক করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

এনসিপি : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ‘বিএনপি একসময় গণভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটিকে অবজ্ঞার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানই বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া, অন্তর্বর্তী সরকার এবং এই নির্বাচনের মূল ভিত্তি ও বৈধতা। সব বিষয় শুধু সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই কমিশনের কোনো কার্যক্রমকে এখন অসাংবিধানিক বলার সুযোগ নেই। জনগণের রায় সংস্কারের পক্ষে আসার পরও সংসদ সেটিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, গণভোট কোনো নতুন বিষয় নয়; অতীতেও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এ ধরনের বিষয় মীমাংসা হয়েছে। বিএনপির অনেক সংসদ সদস্য এবং দলীয় প্রধানও একসময় গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিন দলীয় জোটের রূপরেখা ভঙ্গ করায় তৎকালীন সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে দেশে আবারো ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

২৪ এপ্রিলের গণসমাবেশ : গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আগামী ২৪ এপ্রিল শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। গত রোববার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণসমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির এক বৈঠকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। জনগণের রায়ে ঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা প্রমাণ করে যে সরকার জনগণের আকাক্সক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বিলম্বিত করে সরকার মূলত ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে জনগণের স্পষ্ট রায় উপেক্ষা করা জাতির সাথে প্রতারণার শামিল। অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাই।

সংসদে আলাদা অধিবেশন আহ্বান করতে হবে : খেলাফত মজলিসের নেতারা সরকারকে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংসদে আলাদা অধিবেশন আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার কেন্দ্রীয় কমিটির এক বৈঠকে তারা বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে ক্ষমতাসীন দলকে অবশ্যই অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। গণভোটে বিশাল ব্যবধানে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। তাই গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারকে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংসদে আলাদা অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। আমরা বাংলাদেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদী সরকার দেখতে চাই না।

এবি পার্টি : সংবিধান অনুযায়ী সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের এমন বক্তব্যের পর তার সমালোচনা করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পালাইয়া গেলে কী হবে সংবিধানে যদি লেখা থাকতো তাইলে সবাই দলবেঁধে ক্যান্টনমেন্টে গেল কেন? আবার সেখান থেকে বঙ্গভবনে গিয়ে ছাত্রদের সাথে মিটিং করে ‘কনভিক্টেড’ ড. ইউনূসকে সরকার প্রধান বানাতে হলো কেন?’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘বড় বড় বিশেষজ্ঞরা বসে সংবিধান খুলে সমাধান বের করে ফেললেই তো হতো। অথবা সালাহউদ্দিন ভাই শিলং থেকে সংবিধান পাঠ করে একটা সমাধান পাঠাই দিলেই তো পারতেন।’