নয়া দিগন্ত ডেস্ক
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আরাকান আর্মির সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তোষণ নয়। বাংলাদেশে বসবাসরত ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন সহজ করার লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি সংলাপের কথা বাংলাদেশ বিবেচনা করছে। যেহেতু আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা দখল করে রেখেছে, তাই কার্যকর যোগাযোগের প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সাময়িক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হওয়া যোগাযোগকে রাজনৈতিক আস্থা, স্বীকৃতি বা অংশীদারিত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। আরাকান আর্মির সাথে সম্পৃক্ততা কি রোহিঙ্গাদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে নাকি ধীরে ধীরে এমন একটি সশস্ত্র কর্তৃপক্ষকে বৈধতা দেবে, যারা কথিতভাবে সেসব মানুষের ওপর গুরুতর নির্যাতন চালিয়েছে যাদেরকে বাংলাদেশ ফেরত পাঠাতে চাইছে?
২০১৭ সালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ, গ্রাম ধ্বংস এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিসহ নৃশংসতার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দায়ী। তবে, রাখাইনের কিছু এলাকায় সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নিরাপদ হয়নি। বরং নতুন শাসকদের কর্মকাণ্ড গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক গুম, জোরপূর্বক নিয়োগ, জোরপূর্বক শ্রম, চাঁদাবাজি, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং চলাচল ও কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ করেছে। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়কে মেনে নিতে ব্যর্থতা এবং তাদের প্রতি বর্জনমূলক মনোভাবের জন্যও আরাকান আর্মি সমালোচিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জন্য আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বুথিডং টাউনশিপের হোয়ার সিরি গ্রামে বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হওয়া এবং বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনার খবর দেয়। সংস্থাটি বলেছে, এ কথিত নির্যাতনগুলোর কয়েকটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আরাকান আর্মি দায় অস্বীকার করলেও, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা এখনো তাদের বাড়ি থেকে নিখোঁজ এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাবাসনের যেকোনো পরিকল্পনার জন্য একটি মৌলিক জটিলতা তৈরি করে। রোহিঙ্গাদের এমন জায়গায় ফিরে যাওয়ার আশা করা অবাস্তব হবে, যেখানে কার্যত সরকার তাদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে অভিযুক্ত।
বাংলাদেশের পরিস্থিতির জরুরি অবস্থা বিবেচনা করে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটের একটি স্থায়ী সমাধানের সুস্পষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এ দেশে বসবাস করছে এবং তাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কক্সবাজার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার অবকাঠামো, জনসেবা এবং পরিবেশগত, সামাজিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিলও ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
কিন্তু চরম হতাশা শরণার্থীদের এমন জায়গায় ফেরত পাঠানোর কোনো অজুহাত হতে পারে না, যেখানে তাদের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নাগরিকত্ব ছাড়া প্রত্যাবর্তন কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এমন একটি কর্তৃপক্ষের দ্বারা শাসিত শিবির বা বিচ্ছিন্ন বসতিতে ফিরে যাওয়া, যারা রোহিঙ্গা জনগণকে গ্রহণ করবে না, তা হবে সঙ্কটটিকে বাংলাদেশ থেকে অন্য একটি বন্দিশিবিরে স্থানান্তরিত করা মাত্র।
বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায়, আরাকান আর্মির বিরোধিতা করলে তা প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে সীমিত করতে পারে এবং সীমান্ত বরাবর বাস্তব যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অন্য দিকে, শর্তহীন সম্পৃক্ততা রোহিঙ্গাদের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না ঘটিয়েই গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে। সুতরাং, সব সম্পৃক্ততা অবশ্যই শর্তসাপেক্ষ, উন্মুক্ত এবং সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যসহ হতে হবে।
যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে, আরাকান আর্মিকে প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা পরিচয়কে গ্রহণ ও স্বীকৃতি দিতে হবে এবং রাখাইন রাজ্যে বসবাসের ঐতিহাসিক অধিকার প্রয়োগে তাদের স্বাগত জানাতে হবে। রোহিঙ্গা বাসিন্দাদের নিজ জন্মভূমি ও ভূমিতে ফেরার অধিকারের পাশাপাশি চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনার পাশাপাশি, বাংলাদেশের উচিত জাতিসঙ্ঘ ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পাশাপাশি আসিয়ান এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে কূটনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকা। রোহিঙ্গা জনগণের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন এবং পরিণামে নাগরিকত্ব লাভের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণাধীন একটি ব্যবস্থা তৈরি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেখানে বেসামরিক সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে।
জাতিসঙ্ঘ এবং স্বাধীন মানবিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে প্রত্যাবর্তন এলাকাগুলোতে পূর্ণ ও অবাধ প্রবেশাধিকার দেয়া উচিত। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর দেয়া মৌখিক আশ্বাসের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে প্রাধান্য দিতে হবে। হত্যা, জোরপূর্বক গুম, জোরপূর্বক শ্রম, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগগুলোও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা উচিত এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত, তারা মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী, আরাকান আর্মি বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত থাকুক বা না থাকুক।
সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় তাদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে করা কোনো চুক্তিই বৈধ হতে পারে না। রোহিঙ্গা সঙ্কট মিয়ানমারে শুরু হয়েছিল এবং সেখানেই এ সঙ্কটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ সব ধরনের যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা এবং আরাকান আর্মিকে নিঃশর্ত রাজনৈতিক স্বীকৃতির মতো একটি মিথ্যা পছন্দের মধ্যে পড়তে পারে না। সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তোষণ আবশ্যক নয়। বাংলাদেশের নীতিতে আরাকান আর্মির ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণকে স্বীকার করতে হবে, তবে তাদের আচরণের অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যাবে না।
সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থীদের কত দ্রুত প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে, তা কোনো প্রত্যাবাসন কর্মসূচির সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এর বিচার হওয়া উচিত, তারা স্বীকৃত নাগরিক হিসেবে নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় ফিরে আসছে কি না, যাতে কোনো রকম নিপীড়ন ছাড়াই নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত এ শর্তগুলো পূরণ না হবে, প্রত্যাবাসন একটি রাজনৈতিক কথার কথা ছাড়া আর কিছুই হবে না, কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।



