গাজা শান্তি পরিষদে কয়েকজন বিশ্বনেতাকে আমন্ত্রণ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • গাজা শাসনে ‘মিশন স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ মার্কিন-সমর্থিত ফিলিস্তিনি কমিটির
  • শান্তি পরিষদের সদস্য তালিকায় ঘোর আপত্তি ইসরাইলের

শুরুতে গাজা, পরে বৈশ্বিক বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত নিরসনের উদ্দেশ্যে বানানো যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদে যোগ দিতে কয়েকটি দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মিসর, জর্দান, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবে ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনের কাছেও আমন্ত্রণপত্র গেছে বলে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চেয়ারম্যান বানিয়ে করা এই বোর্ডের সদস্য হিসেবে এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের নাম ঘোষিত হয়েছে। তাদের সাথে যুক্ত হবেন ধনকুবের মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা ও ট্রাম্পের উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল। জাতিসঙ্ঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত নিকোলে ম্লাদেনভ গাজাবিষয়ক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন। এই বোর্ড আপাতত গাজার অন্তর্বর্তীকালীন ফিলিস্তিনি সরকার ‘প্যালেস্টাইন টেকনোক্র্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের’ দেখভাল করবে।

সামনের সপ্তাহগুলোতে বোর্ডের আরো সদস্যের নাম ঘোষিত হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। এর পাশাপাশি গাজার অন্তর্বর্তী ফিলিস্তিনি সরকারকে সহায়তা করতে ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘গাজা নির্বাহী পরিষদও’ গঠন করা হয়েছে, যার সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, জাতিসঙ্ঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি বিষয়ক সমন্বয়ক সিগরিদ কাগ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী রিম আল-হাশিমি এবং ইসরাইল-সাইপ্রাসের দ্বৈত নাগরিক ধনকুবের ইয়াকির গাবায়কে।

এই বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে ইসরাইল এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; তুরস্কের ফিদানের ব্যাপারে আপত্তি থেকে তারা এ অবস্থান নিয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। শুরুতে গাজা এবং পরে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সঙ্ঘাত নিরসনেও এ ‘বোর্ড অব পিসের’ ভূমিকা থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। এটি একে অপরের সাথে যুদ্ধে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সমালোচকরা এই উদ্যোগকে ‘ঔপনিবেশিক আমলের কাঠামোর’ সাথে তুলনা দিচ্ছেন। তারা ইরাক যুদ্ধের সময় ব্লেয়ারের ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে ব্রিটিশদের নগ্ন হস্তক্ষেপের নানান উদাহরণ স্মরণ করিয়ে বোর্ডে তাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন। বিশ্বনেতাদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রের সাথে একটি ‘সনদও’ যুক্ত করে দেয়া হয়েছে বলে রয়টার্সকে দু’টি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। ‘জাতিসঙ্ঘ সনদের মূলনীতিগুলোকে পাশ কাটিয়ে ‘ট্রাম্পের জাতিসঙ্ঘ’ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র ও সনদ সম্বন্ধে অবগত এক কূটনীতিক এমনটাই বলেছেন। তিনি একে ‘বৈশ্বিক সঙ্ঘাত নিরসনে এক সাহসী নতুন দৃষ্টিভঙ্গি’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউজ আরো জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানবিষয়ক কমান্ডার মেজর জেনারেল জেসপার জেফারসকে গাজার ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর’ কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ গৃহীত এক প্রস্তাবে ‘বোর্ড অব পিস’ ও এর সাথে থাকা দেশগুলোকে গাজার জন্য এ স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল।

গাজা শাসনে ‘মিশন স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ মার্কিন-সমর্থিত ফিলিস্তিনি কমিটির

গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত মার্কিন-সমর্থিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি তাদের ‘মিশন স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করেছে। কমিটির প্রধান আলী শাথ জানিয়েছেন, গাজার পুনর্গঠন শুধু অবকাঠামো নয়, সামাজিক পুনরুদ্ধার ও শান্তির ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। খবর আনাদোলু এজেন্সির। এক বিবৃতিতে শাথ বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে এবং গাজার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের সহায়তায় তারা কাজ করবেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজ্যুলিউশন ২৮০৩ ও ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার আওতায় এই কমিটি কাজ করছে। মিশন স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, কমিটির অগ্রাধিকার হবে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার পুনরুদ্ধার এবং স্বচ্ছ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা। শাথ বলেন, ‘আমরা মানবিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, বোর্ড অব পিস ও এক্সিকিউটিভ বোর্ডে ইসরাইলপন্থী ব্যক্তিদের উপস্থিতি কমিটির স্বায়ত্তশাসন সীমিত করতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রশ্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও দখলদারত্বের অবসান পাশ কাটিয়ে শুধু অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে জোর দেয়ার অভিযোগও উঠছে।

যুদ্ধবিরতির মুখোশে দখল ও দায়মুক্তির রাজনীতি

গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পশ্চিমা বিশ্ব যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কাগজে-কলমে যুদ্ধ থেমেছে, এই দাবিকেই তারা সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ফিলিস্তিনিদের জন্য যুদ্ধবিরতি মানে নিরাপত্তা, মর্যাদা বা ন্যায়ের নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে দখল, সহিংসতা ও দায়মুক্তিকে বৈধ করার এক নতুন রাজনৈতিক মুখোশ। আলজাজিরার মতামত কলামে বলা হয়েছে- গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এক মাসেই শত শত হামলা হয়েছে- ঘরবাড়ি ভাঙচুর, ফসলি জমিতে আগুন, শিশু ও কৃষকদের ওপর আক্রমণ। অথচ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থেকেছে নীতিগত নিন্দা আর ‘উদ্বেগ’-এ। এই নীরবতাই ইসরাইলকে বার্তা দিচ্ছে যে সহিংসতার মূল্য নেই।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা। বাস্তবে এই দু’টি একই দখলদার কাঠামোর অংশ। সেনাদের উপস্থিতিতেই বসতি স্থাপনকারীরা অস্ত্র হাতে ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখায়, আক্রমণ চালায়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ-সবই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উপাদান।

ব্রিটেনসহ পশ্চিমা সরকারগুলো দাবি করে, তাদের ‘প্রভাব’ আছে। কিন্তু সেই প্রভাব প্রয়োগের প্রশ্ন এলেই তারা পিছু হটে। অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা, নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ফৌজদারি আদালতের জবাবদিহিকে সমর্থন- এসব পদক্ষেপ নেয়ার বদলে তারা কূটনৈতিক ভারসাম্যের অজুহাতে নীরবতা বেছে নেয়। ফলাফল হলো, আন্তর্জাতিক আইন কাগজে রয়ে যায়, মাঠে নয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে-যুদ্ধবিরতি কার জন্য? যদি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ফিলিস্তিনিরা নিহত হয়, বাস্তুচ্যুত হয়, জীবিকা হারায়, তবে সেটি শান্তি নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত সহিংসতার ধারাবাহিকতা। ন্যায়বিচার কেবল বিবৃতিতে আসে না; আসে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাহসে। ফিলিস্তিনিদের জীবনকে ‘ব্যয়যোগ্য’ ধরে নেয়ার এই বৈশ্বিক মানসিকতা বদলানো না গেলে, ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দটি ইতিহাসে শুধু এক নির্মম ভণ্ডামির নাম হয়েই থাকবে।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় হামলা অব্যাহত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় বাস্তবে কোনো স্বস্তি আসেনি বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪৬৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। গাজা সিটির একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী মাহমু বলেন, ‘যুদ্ধ আর যুদ্ধবিরতির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রতিদিন হামলা চলছে।’ সাম্প্রতিক বিমান হামলায় দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ জানায়, পানি, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালগুলো ন্যূনতম সেবা দিতে পারছে না, শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত অচল। ইউনিসেফের মতে, গাজার প্রতিটি শিশুর মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহত হয়েছেন ৭১ হাজারের বেশি মানুষ, আহত এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলেও ইসরাইলি বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় শান্তি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের হতাশা বাড়ছে।

‘ইয়েলো লাইন’ পার হলেই গুলি

গাজায় যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরাইলি বাহিনী যে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এ অবস্থান নিয়েছে, সেটি এখন ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রাণঘাতী সীমারেখায় পরিণত হয়েছে। এই রেখা অদৃশ্য বা অস্পষ্ট হওয়ায় তা অতিক্রম করলেই গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। খবর এপির। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর নিহত ৪৪৭ জনের মধ্যে অন্তত ৭৭ জন এই ইয়েলো লাইনের কাছে ইসরাইলি গুলিতে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে কিশোর ও শিশুও রয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, অধিকাংশ নিহত ‘হুমকি সৃষ্টি করছিল’, তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তা অস্বীকার করছে।

১৭ বছর বয়সী জাহের শামিয়ার খেলতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন এবং পরে একটি বুলডোজারে পিষ্ট হন বলে চিকিৎসকদের ভাষ্য। তিন বছর বয়সী আহেদ আল-বায়ুক নিজের তাঁবুর বাইরে খেলছিল, তখন গুলিতে নিহত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েলো লাইনের অবস্থান নিয়ে ইসরাইলি মানচিত্র ও বাস্তব চিহ্নের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য এই সীমারেখা বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধবিরতির আড়ালে এটি স্থায়ী ভূমি দখলের পরিকল্পনা করছে ইসরাইল।