অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা যার ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক সময়ে চরম স্থবিরতায় ধুঁকছে দেশের অর্থনীতির এই প্রধান খাতটি। গত বছরের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও পুঁজিবাজারকে আস্থায় নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। কারণ অতীতে বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও তাদের সহযোগীরা পুঁজিবাজারকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেছে। দুই দুই বারের বিপর্যয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। শেষ বিপর্যয় ২০১০ সালের পর পুঁজিবাজার আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তখন যে রক্তক্ষরণ হয় তার রেশ এখনো বয়ে চলেছে দেশের পুঁজিবাজার।
২০১০ সালের পুঁজিবাজারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এক প্রকার খুঁড়িয়ে চলা পুঁজিবাজারগুলো কিছুটা সোজা হতে চাইলে সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মধ্যে পড়ে ২০২০ সালের কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে। পরবর্তিতে এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতায় গোটা বিশ^ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লে তার ধাক্কা লাগে আমাদের পুঁজিবাজারেও। আগে বারবার প্রতারিত হওয়া বিনিয়োগকারীরা এ দু’টি সঙ্কটে আবারো নিজেদের কষ্টার্জিত পুঁজি হারাতে বাধ্য হন। আর এসব কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি নিজেদের সর্বস্ব হারানো বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা পৌঁছেছে চরমে। এটাই তাদের বাজার থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি এই অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থা সঙ্কটের কারণে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬৬ হাজার ৫১৪টি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি শেয়ারশূন্য হয়ে পড়েছে। ক্রমহ্রাসমান সূচক, বাজার মূলধন কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা তাদের ইক্যুইটি বিক্রি করে বাজার ছেড়েছেন। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ আবারো প্রচণ্ড লোকসান স্বীকার করে সর্বস্ব হারানো বেদনার বোঝা মাথায় নিয়ে বাজার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
সিডিবিএল-এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় বর্তমানে মোট বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৮৯টি কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৯ হাজারে। এর মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব কমেছে ২৭ হাজার ৮৮৪টি এবং নারী বিনিয়োগকারীদের হিসাব কমেছে ১৫ হাজার ২৪টি। আর অনিবাসী বা এনআরবি বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও কমেছে ৩ হাজার ১৪৪টি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পতন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক অনাস্থারই প্রতিফলন।
সিডিবিএল’র তথ্য বিশ্লেষণে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় যেটি জানা গেল তা হলো, বর্তমানে সচল থাকা ১৬ লাখ ৩৯ হাজার অ্যাকাউন্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিসাবে কোনো শেয়ার নেই। প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার বিও অ্যাকাউন্ট এখন জিরো ব্যালেন্স বা শেয়ার শূন্য হিসাব সচল রয়েছে। অর্থাৎ, অনেক বিনিয়োগকারী কাগজে-কলমে অ্যাকাউন্ট সচল রাখলেও বাস্তবে কোনো বিনিয়োগে নেই। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত লেনদেন করেন এমন সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আসলে ৪ থেকে ৫ লাখের বেশি হবে না।
এ দিকে গত ২৯ জুলাই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (বিএসইসি) সিডিবিএল থেকে নেয়া তথ্য অনুসারে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিভিন্ন স্তর বিন্যাশ করে সচল বিও হিসাবের একটি চিত্র প্রকাশ করে। তাতে ওই সময় কিছুটা আশাবাদী হওয়া গেলেও পরবর্তিতে বাজার পরিস্থিতির আরো অবনতি তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই সময়ে চিত্রে দেখা যায় ৫০ লাখ বা তার ঊর্ধ্বে বিনিয়োগ রয়েছে এমন বিও হিসাব আগের বছরের একই সময় থেকে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিএসইসি থেকে সেই সময়ে পাওয়া তথ্য মতে, এক লাখ টাকার উপরে যে সব অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগ রয়েছে সে বিও হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। এমনকি ৫০০ কোটি বা তার উপরে বিনিয়োগ করা বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিগত ছয় মাসে পুঁজিবাজারে বারবার ধারাবাহিক পতনের ঘটনা ঘটেছে যাতে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রসঙ্গত: মানুষের বিনিয়োগ ভাবনার জন্য হয়েছে অর্থনীতির বিভিন্ন ধাপে নিজেদের প্রয়োজন মেঠাতে সম্পদের উৎকর্ষ সাধনে। তাই যে কেউই বিনিয়োগের পূর্বে তার লাভ-লোকসান হিসাব করেন যেখানে বিনিয়োগ ঝুঁকি কম থাকে। লোকসানে পড়তে না হয়। কিন্তু আমাদের শেয়ারবাজারে সে সমীকরণ কাজ করছে না। বছরের পর বছর এখানে বিনিয়োগকারীরা লোকসানই গুনে চলেছেন। কোনো সময় তা প্রতারিত হয়ে আবার কোনো সময় তা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে। আর এটাই দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে স্থবিরতার দিকে নিয়ে চলেছে।
গত বছরের পট-পরিবর্তনের পর গঠিত কমিশন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা বিভিন্ন আইন সংশোধন করতে গেলে তাও দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের চলতে থাকা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে এমন ধারণারও জন্ম নিয়েছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। নতুন করে আইপিও বিধিমালা তৈরি ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা সংশোধন ও মার্জিন রুলস বিধিমালায় সংশোধনের মতো সিদ্ধান্তগুলো অতি সম্প্রতি পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। বাজারকে দ্রুততম সময়ে বড় লোক হওয়ার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ কঠিন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতায় থাকতে রাজি নন। নিজেদের খেয়ালখুশি মতো তারা বাজারকে মুনাফা লুণ্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চান। এটাই দেশীয় পুঁজিবাজারকে বছরের পর বছর ধরে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে গেছে।
পুঁজিবাজারের পতনের নেপথ্যের কারণ হিসাবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভালো মানের নতুন আইপিও (আইপিও)-র অভাব, পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূতকরণের প্রভাবে বিনিয়োগ হারানো এবং বাজারের সামগ্রিক অস্থিরতাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ২০২৫ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৩৩ পয়েন্ট হারিয়েছে এবং বাজার মূলধন ৭ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৬ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করেন, বাজারকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে বিধিবিধানগুলোতে যেমন কঠিনভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন তেমনি বিনিয়োগকারীদেরও বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায় রয়েছে। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসব বিধিবিধান কার্যকর করতে বিনিয়োগের যে চিরাচরিত সূত্র রয়েছে তার বাইরে গিয়ে তা সম্ভব নয়।



