গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। দলীয় কার্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ, প্রচার-প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের দরকার হয়। তবে প্রশ্ন হলো-এই অর্থের উৎস কী এবং এর ব্যয় প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অর্থায়নের এই বিষয়টি আবারো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কাগজে-কলমে স্বচ্ছতা, বাস্তবে লুকোচুরি
দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত দলগুলোকে প্রতি বছর তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। কিন্তু এই হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে একটি আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তব অর্থের সিংহভাগই অঘোষিত থেকে যায়। এই অস্বচ্ছতা কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থা নয়, পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত দলগুলোকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দিয়ে অডিট করিয়ে প্রতি বছর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে হিসাব জমা দিতে হয়। ইসি’র তথ্যমতে, দলগুলোর আয়ের প্রধান উৎস সদস্য চাঁদা, মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও অনুদান। তবে পরিসংখ্যান ঘাঁটলে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা যায়। বড় দলগুলোর বার্ষিক আয় দেখানো হয় মাত্র কয়েক কোটি টাকা, যা দিয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের দলের বিশাল সাংগঠনিক ব্যয় মেটানো এক প্রকার অসম্ভব।
অদৃশ্য অর্থের পাহাড় ও নির্বাচনী ব্যয়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো যে হিসাব দেয়, তা প্রকৃত ব্যয়ের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ অর্থের কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড থাকে না।
সবচেয়ে বড় অস্বচ্ছতা দেখা যায় নির্বাচনের সময়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক প্রভাবশালী প্রার্থী কেবল নির্বাচনের দিনেই পোলিং এজেন্ট ও পরিবহন খাতে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফেলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক আসনে প্রার্থীর প্রকৃত ব্যয় দুই থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল অর্থ মূলত নগদ লেনদেনের মাধ্যমে হাতবদল হয়, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।
ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ও নীতিনির্ধারণী প্রভাব
রাজনৈতিক অর্থায়নের এই অস্বচ্ছতা সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি করে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘করপোরেট খাত থেকে রাজনৈতিক দলগুলোতে বিপুল অনুদান আসে, যা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দাতাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সরকারি বড় প্রকল্প, টেন্ডার এবং ব্যাংক ঋণের সুবিধার সাথে এই রাজনৈতিক অনুদানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই অলিখিত লেনদেনের ফলেই দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে এবং মেগা প্রকল্পের ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে।
অসম প্রতিযোগিতা ও বিরোধী দলের সঙ্কট
অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অসম প্রতিযোগিতা। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, তারা সমানভাবে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পায় না। প্রশাসনিক চাপের কারণে ব্যবসায়ীরা বিরোধী দলকে অনুদান দিতে ভয় পান, কারণ এতে আয়কর বা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার হয়রানির ঝুঁকি থাকে। ফলে আর্থিক দুর্বলতার কারণে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী মাঠে পিছিয়ে পড়ে, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো রাজনৈতিক অর্থায়নে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে। যেমন- যুক্তরাজ্য : ৭,৫০০ পাউন্ডের বেশি অনুদান দিলে দাতার নাম ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
কানাডা : করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা ট্রেড ইউনিয়নের সরাসরি অনুদান নিষিদ্ধ।
জার্মানি : দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে রাষ্ট্র থেকে তহবিল পায়, যা ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা কমায়।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
রাজনৈতিক অর্থায়নের এই অস্বচ্ছতার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ব্যবসায়ীরা যখন কালোপথে রাজনৈতিক অনুদান দেন, তখন সেই টাকা তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতার পকেট থেকে তুলে নেন। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয় না, কারণ সিন্ডিকেটের হোতারাই অনেক সময় বড় অর্থ জোগানদাতা।
উত্তরণের উপায় : সুপারিশমালা
এই জট খুলতে বিশ্লেষকরা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন :
১. স্বাধীন অডিট : দলগুলোর হিসাব কেবল নিজস্ব অডিটর নয়, ইসির মনোনীত স্বাধীন প্যানেল দিয়ে যাচাই করতে হবে।
২. ব্যাংকিং লেনদেন : নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি সব ধরনের রাজনৈতিক লেনদেন বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে।
৩. তথ্য প্রকাশ : দাতার পরিচয় জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
৪. কঠোর দণ্ড : ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন বা ভুয়া হিসাব দিলে প্রার্থিতা বাতিল বা দলের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে প্রয়োগ করতে হবে।
৫. স্টেট ফান্ডিং : রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবসায়ীদের প্রভাবমুক্ত রাখতে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যবস্থা করা নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে পারে।
পরিশেষে, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই অস্বচ্ছতার জট খোলা সম্ভব। অন্যথায় গণতন্ত্রের আড়ালে কালো টাকার শাসনই দীর্ঘায়িত হবে।



