অত্যাবশ্যকীয় ২৯৫ ওষুধের দাম বেঁধে দেবে সরকার

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে সরকার মোট ২৯৫টি জেনেরিক ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা ও ওষুধপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে তালিকাভুক্ত সব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে। তবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, নতুন তালিকায় বর্তমানে ২৯৫টি ওষুধ রয়েছে এবং উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আরো একটি ওষুধ অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব এসেছে। সেটা যুক্ত হলে তালিকাটি ২৯৬ পর্যন্ত হতে পারে। এবারের তালিকায় আগের তুলনায় ১৩৫ বা ১৩৬টি নতুন ওষুধ যুক্ত হয়েছে। এই তালিকাভুক্ত সব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে, এটাই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। মূল্য নির্ধারণের েেত্র যেসব ওষুধ বর্তমানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো ধাপে ধাপে নির্ধারিত দামে নামিয়ে আনতে হবে। আর যেসব ওষুধ কম দামে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো চাইলে ওই দামে থাকতে পারবে অথবা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় করতে পারবে।

পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য চার বছর সময় দেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে চার বছরের মধ্যে সব ওষুধকে সরকারের নির্ধারিত দামের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, সংজ্ঞাগতভাবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এমন ওষুধ, যা দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের অধিকাংশ রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয়। ফলে এসব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি এ সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, অত্যাবশ্যকীয় তালিকার বাইরে থাকা প্রায় এক হাজার ১০০ জেনেরিক ওষুধের েেত্র নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ না করে একটি মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হবে। এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত মূল্যের ১৫ শতাংশ কম বা বেশি দামে বিক্রি করা যাবে। তিনি বলেন, যেসব ওষুধ সাতটির বেশি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে, সেগুলোর বাজারে প্রচলিত গড় বিক্রিমূল্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো ওষুধ বাজারে ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হলে তার গড় মূল্য ১৫ টাকা ধরা হবে এবং এর সাথে ১৫ শতাংশ ওঠানামার সুযোগ থাকবে। আর যেসব ওষুধের উৎপাদক সাতটির কম, সেেেত্র আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হবে।

উপদেষ্টা পরিষদ ওষুধের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত নীতিমালারও অনুমোদন দিয়েছে, যা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান। নীতিমালাটি কার্যকর হলে নতুন ও পুরনো, কোনো ওষুধই মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে না। নীতিমালায় দেশীয় এপিআই (ওষুধের কাঁচামাল) উৎপাদন সমতা বাড়াতে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী, এপিআই আমদানির আগে আমদানিকারকদের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর (ডিজিডিএ) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। অনাপত্তিপত্র পেতে আমদানিকারককে প্রমাণ করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট এপিআই দেশে উৎপাদিত হয় না, অথবা পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই, কিংবা দেশীয় উৎপাদিত এপিআইয়ের দাম আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্যের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। আবেদন পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে অনাপত্তিপত্র প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এদিকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণে গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৮ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা: মো: শাহিনুল আলম ওই টাস্কফোর্সের প্রধান। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে তা বিলম্ব হয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার নতুন তালিকাটি চূড়ান্ত করেছে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে অ্যান্টিবায়োটিক, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিক আলসার, কৃমিনাশক, ব্যথানাশক, হাঁপানি ও ভিটামিনসহ ২৮৬টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। তবে সে সময় মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করতে পেরেছিল। যদিও প্রতি বছর তালিকা হালনাগাদের কথা থাকলেও গত ৯ বছরে কার্যকর তদারকি ছিল না।