পাচার হওয়া ঋণের অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি উদ্যোগ

মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য, বিনিয়োগ বাড়াতে বহুমুখী পরিকল্পনা

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ, সর্বজনীন পেনশন স্কিম জনপ্রিয়করণ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবেলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের চলমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিভিন্ন সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক অর্থ পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে। কুড়িগ্রাম-১ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো: আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো ৯টি আন্তর্জাতিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের সাথে নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রথম পর্যায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্র“প-সংক্রান্ত ছয়টি মামলাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

নওগাঁ-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো: ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।

তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দিতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের জন্য ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫৫ লাখ পরিবারকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। একই সাথে এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা বিতরণ এবং ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, কোল্ড চেইন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সংরক্ষণাগার ও লজিস্টিকস উন্নয়নের পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

চাঁদপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি সঞ্চয়ী হিসাব এবং ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি ঋণ হিসাব। বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ হার শতভাগে উন্নীত করতে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদে ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল-২’ (এনএফআইএস-২) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নড়াইল-১ আসনের সরকারি দলের সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে সর্বজনীন পেনশন স্কিম জনপ্রিয় করতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে র‌্যালি, পেনশন মেলা, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগে এ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পাবনা, বগুড়া, নওগাঁ, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও গাইবান্ধায় প্রচারণা চালানো হয়েছে। আগামী জুলাইয়ে নড়াইলেও অনুরূপ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নেত্রকোনা-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার ‘থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, এফডিআই জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বাংলাবিজ’ নামে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে এফডিআই হিট ম্যাপ প্রকাশ, পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন ইপিজেড এবং কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় আড়াই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চাঁদপুর-২ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো: জালাল উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব মোকাবেলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। রফতানি বহুমুখীকরণ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ ও জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নতুন শ্রমবাজার হিসেবে রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া ও নর্থ মেসিডোনিয়ার সাথে চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর বিদ্যমান ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনাও বহাল থাকবে।

সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মুদিরদোকান, পোশাক ও কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিকস, প্লাস্টিক ও সিরামিক পণ্য, জুতা, হার্ডওয়্যার, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকস বিক্রেতা, ফার্নিচার, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও রেস্টুরেন্টসহ কয়েকটি খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংরক্ষিত নারী আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি এডিপির অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

অন্য দিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপি সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬’-এর মাধ্যমে অনলাইন জুয়াকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের লেনদেন স্থগিত বা জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এ বিষয়ে সিআইডি মামলা দায়ের করে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ এবং বহিঃখাতের ঝুঁকি মোকাবেলার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার কাজ করছে।