রাষ্ট্র সংস্কারেই নিহিত ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা : নতুন স্বপ্ন ও অনিশ্চয়তার দোলাচল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোট ইস্যুতে সৃষ্ট সঙ্কট দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; যেখানে মূল প্রশ্ন- ক্ষমতার এই বিন্যাস কি কেবলই দলবদল, নাকি কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন?

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

এক দিকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আকাক্সক্ষা, অন্য দিকে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার দোলাচল- এমন এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে দেশের রাজনীতি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোট ইস্যুতে সৃষ্ট সঙ্কট দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে; যেখানে মূল প্রশ্ন- ক্ষমতার এই বিন্যাস কি কেবলই দলবদল, নাকি কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন?

সংস্কারের গতি ও জুলাই সনদ

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্নীতি ও অপশাসন দূরীকরণে যে সংস্কারের সূচনা করেছিল, তার ধারাবাহিকতায় প্রণীত হয় ‘জুলাই সনদ’। প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে এর গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন থাকলেও সংস্কারের ধীরগতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে।

মাঠের রাজনীতি : নতুন সমীকরণ

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে মাঠের প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সরকারিদল বিএনপি এবং সংসদে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট।

বিএনপির চ্যালেঞ্জ : দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জুলাই সনদ ও গণভোট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার সম্পন্ন করা। এ ছাড়া দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য বড় পরীক্ষা।

কিং-মেকার জামায়াত-এনসিপি : সংসদে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত এনসিপি একটি সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে নিজেদের জানান দিচ্ছে। ২০২৬-এর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জোট ‘কিং-মেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সঙ্কটে আওয়ামী লীগ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

দেশের পুরনো দল আওয়ামী লীগ এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে। শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মগোপন ও জনরোষের কারণে দলটি মাঠের রাজনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। নেতৃত্ব পরিবর্তন করে তারা কি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে পারবে, নাকি দীর্ঘকাল অন্তরালে থাকবে- সেটি এখনো অনিশ্চিত।

অন্য দিকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক প্রভাব বরাবরের মতোই স্পষ্ট। ভারতের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, পশ্চিমা বিশ্বের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ এবং চীন-রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা আগামীর সরকারের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা (ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র) এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সঙ্কট (ডলার সঙ্কট ও দ্রব্যমূল্য) পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত ও ‘সিস্টেম চেঞ্জ’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে কোনো একক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্যের দিন শেষ। এখন দরকার একটি অন্তর্মুখী মূল্যায়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের ইতিহাস ও ভুলের মুখোমুখি হওয়া এবং একটি কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও দায়বদ্ধ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মতিন ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের অবস্থা যে ভালো সেটি বলা যাচ্ছে না। এই সরকারের মাত্র দুই মাস পার হলো। চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি এসব কিন্তু বন্ধ হয়নি। অন্য দিকে রাজনৈতিক পরিবেশ ফের ঘোলাটে হচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সেই আন্দোলন কতটা সফলতা পায় সেটি দেখার বিষয়। কারণ সরকারিদল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অতীতে একসাথে আন্দোলন করেছে, সরকার গঠন করেছে। তাই তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি ধামকি রাজনৈতিক মতবিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে বিশ^ রাজনীতির প্রভাব দেশের রাজনীতিতে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই চার্টার’ বা সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধীরা। সরকার যদি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ না করে তাহলে পুনরায় অস্থিরতা সৃষ্টির ঝুঁকি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সরকার ও বিরোধীদলের অবস্থান

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, তার দল ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর রূপরেখায় গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করতে চায়। তারা এমন একটি শাসনব্যবস্থা চান, যেখানে কোনো অন্যায় ও বৈষম্য থাকবে না। সরকার কোনো সঠিক পদক্ষেপ নিলে সমর্থন দেবে, তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করলে বা অবিচার হলে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে। দলের নেতারা দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের চেতনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেহেতু সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটকে মানছেন না, তাই তারা বাধ্য হয়েই রাজপথে নেমেছেন।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এ প্রতিবেদককে বলেন, রাজনীতির মৌলিক ধারা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। জনগণের বাস্তব চাহিদাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে রূপান্তর করতে না পারলে জনগণের দুর্ভোগ একই জায়গায় থেকে যাবে। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, এই কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে জনগণের সেই শক্তিকে পরিবর্তনের পথে ব্যবহার করা হচ্ছে না। জনতার বাস্তবসম্মত রায় বাস্তবায়নে রাজপথ আবারো উত্তপ্ত হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার জনরায় মেনে দায়িত্বশীল ভূমিকাই পালন করবে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিইডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, মানুষের উপকার করা এবং তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির মূল লক্ষ্য। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই সে কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে। যদিও বিরোধীদল এটা নিয়ে রাজনীতি করতে চাইছে। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করেই বিএনপি তার আগামীর পথ চলবে। তবে গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের সমালাচনা করার অধিকার সবার আছে। এটাই রাজনৈতিক সৌন্দর্য। তবে কোনোভাবেই রাজনীতির নামে জনদুর্ভোগ কাম্য হতে পারে না।

উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন দু’টি পথ খোলা- এক দিকে জাতীয় ঐক্য, সংলাপ ও টেকসই উন্নয়ন; অন্য দিকে বিভাজন ও সংঘাত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরবর্তী জঞ্জাল পরিষ্কার করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিহিংসা পরিহার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদের চেতনায় ফিরতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ‘সিস্টেম চেঞ্জ’। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে যেকোনো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।