গত বছর মাসব্যাপী মেলায় দৈনিক বই প্রকাশের হার ছিল ১০৯টি। সে হিসেবে ১২ দিনে নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ১৩০৮টি। কিন্তু এবার তার অবনতি হয়েছে। ১২ দিনে প্রকাশিত হয়েছে ৯৮৯টি বই। সে হিসেবে দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে ৮২ তে। যা গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।
প্রকাশকরা বলছেন, এবার মেলা নিয়ে শুরুতেই অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে তারা নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি পেলেও প্রকাশ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। শেষ সময়ে এসে মেলা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও এই সময়ের মধ্যে নতুন বই প্রকাশের সুযোগ ছিল না। ফলে এবার নতুন প্রকাশনায় তারা পিছিয়ে পড়েছেন।
প্রকাশনা খাতকে প্রসারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই মন্তব্য করে তারা বলেন, মেলায় প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হলেও প্রকাশনা জগতের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। তা ছাড়া কাগজ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অব্যবস্থাপনা, নকল ও মানহীন বইয়ের আধিক্য, এসব কারণে প্রকাশনা জগত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। যার কারণে সৃজনশীল বই কমে যাওয়ার সাথে পাঠক কমছে। এতে প্রকাশনা খাত দিন দিন বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে।
গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১৪৬টি। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।
আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পঠন-পাঠন ও জ্ঞানের পরিধি ছিল ব্যাপক। তার লেখার ভঙ্গিটিও ছিল খুব অন্তরঙ্গ, যে কারণে প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। প্রবন্ধের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে তিনি তৈরি করেছিলেন নতুন এক গদ্যভঙ্গি। সমালোচনা-সাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যকে তিনি সবসময় উঁচু মর্যাদার আসনে রেখেছেন। জীবনভর তিনি নানা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধ ছাড়াও ছোটগল্প লিখতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ বিকশিত রূপটি ধরা পড়েছিল গল্প রচনার সময়। তার গল্প ছিল বৈচিত্র্যময়, অভিনব এবং কখনো কখনো অকল্পনীয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একই সাথে শিল্পী এবং ব্যক্তিমানুষ হিসেবে দরদি। তার একটি বড় গুণ হলো তিনি মানুষের ভালো কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসা করতে পারতেন। শিক্ষক হিসেবেও তিনি সবসময় সবার প্রতি সমান মনোযোগ ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন। লেখক হিসেবে যেমন, তেমনি শিক্ষক ও বৃদ্ধিজীবী হিসেবে এবং সর্বোপরি ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অনেক উচ্চস্থানীয়।
হরিশংকর জলদাস বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন ধী-শক্তিসম্পন্ন অমায়িক একজন মানুষ। উপন্যাস, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ ও নানা তাত্ত্বিক বিষয়ে ছিল তার লেখালেখি। তার উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক। তার সমগ্র কথা-সাহিত্যে সমাজের ও মানুষের দ্বান্দ্বিকতার নানা বিষয় উঠে এসেছে।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একজন শিক্ষক, সাহিত্যিক ও তাত্ত্বিক। তিনি অসাধারণ চিত্র-সমালোচকও ছিলেন। বহুমাত্রিক চিন্তা ও কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি শ্রেণীকক্ষে এবং শ্রেণীকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেছেন, তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক ইসরাইল খান এবং কবি মুহাম্মদ আবদুল বাতেন। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আজ বুধবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : এম শমসের আলী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেবেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। সভাপতিত্ব করবেন আরশাদ মোমেন। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মেলায় এসেছে সবুজপত্র পাবলিকেশন্সের অধ্যাপক মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম মক্কী রচিত ‘যেভাবে নামাজ পড়তেন রাসূলুল্লাহ সা:। বইটি সহিহ হাদিসের আলোকে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নাহসম্মত নামাজের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। এই বইতে অজু থেকে শুরু করে তাকবিরে তাহরিমা, রুকু, সিজদা ও সালাম পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় ছবিসহ (সংস্করণ ভেদে) সুন্নাহ অনুযায়ী বর্ণিত হয়েছে, যা সাহাবিদের বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিস অনুসরণ করে তৈরি। বইটির মূল বিষয়বস্তু অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সা:-এর নামাজের পদ্ধতি। বইটি মক্কা শরিফের উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি হতে সনদপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম মক্কী প্রণয়ন করেছেন, যা শুদ্ধ নামাজ শিক্ষার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য দলিল। এই বইটি রকমারি, চধঃযধমধৎ বা অন্যান্য বুকশপ থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে।
পূর্ব পাকিস্তান রক্ষার শেষ যুদ্ধ : প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরি (১৯৬৯-১৯৭১)। মূল : ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী। অনুবাদ : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। ১৯৭১-দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অনিবার্য ট্র্যাজেডির নাম। এই গ্রন্থ সেই ট্র্যাজেডিকে দেখেছে ক্ষমতার করিডরের একেবারে কাছ থেকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের আলো-ছায়ার মধ্য দিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান ও তার পরিণতিতে পাকিস্তানের ভাঙন- এই বইয়ে তা কেবল ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীরবতা, নৈতিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার এক নির্মম দলিল। লেখক পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের (আইএসপিআর) প্রধান ও প্রেসিডেন্টের প্রেস অ্যাডভাইজার হিসেবে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের উত্তাল সময় প্রত্যক্ষ করেছেন এক বিশেষ অবস্থান থেকে। সেই অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত ডায়েরির নোট ও প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আলোকে তিনি নির্মাণ করেছেন এক প্রথম-পুরুষ সাক্ষ্য- যেখানে ইতিহাসকে সাজানো হয়নি; বরং তার ক্ষতচিহ্নসহ তুলে ধরা হয়েছে।
এই গ্রন্থে নেই পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয়া বিশ্লেষণ, নেই কমিশন রিপোর্ট বা দ্বিতীয় হাতের বয়ান। আছে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এক কর্মকর্তার দ্বিধা, সীমাবদ্ধতা, নীরব ভূমিকা এবং আত্মসমালোচনার সততা। জনসংযোগের ‘কিমোনো’ রূপক থেকে শুরু করে সামরিক রাষ্ট্রের ভেতরের মনস্তত্ত্ব-সব মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে ১৯৭১ বোঝার এক বিরল, অস্বস্তিকর কিন্তু অপরিহার্য পাঠ। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক, ইতিহাস ও দায়বোধের প্রশ্নে এই গ্রন্থ এক প্রয়োজনীয় সেতুবন্ধন রচনা করে।
বাঙালি মুসলমানের মন। আহমদ ছফা। প্রকাশক খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি। বাঙালি মুসলমানের মন হলো প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও লেখক আহমদ ছফা রচিত একটি যুগান্তকারী প্রবন্ধসংকলন, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এই বইটিতে সত্তরের দশকে রচিত মোট ৯টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এখানে বাঙালি মুসলমানের হাজার বছরের বিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে তারা একই সাথে ‘বাঙালি’ ও ‘মুসলমান’ হওয়ার দ্বন্দ্বে ভোগে। বাঙালি মুসলমানের মানসকাঠামো কেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে পিছিয়ে আছে, লেখক ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করেছেন। প্রবন্ধটিতে বাঙালি মুসলমানের গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং চিন্তার স্থবিরতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। আনিসুজ্জামান ও সলিমুল্লাহ খানের মতো অনেক বিশেষজ্ঞ এই গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের গত শতাব্দীর সেরা ১০ চিন্তার বইয়ের একটি হিসেবে গণ্য করেন।
তাদের ‘স্মৃতি ও সৃষ্টি’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি স্মৃতিচারণামূলক প্রবন্ধ গ্রন্থ। এই বইটিতে লেখক বিভিন্ন বিশিষ্টজনদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। গুণী ব্যক্তিদের জীবন, তাদের সৃষ্টি এবং তাদের সাথে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকপাত করা হয়েছে এই সংকলনে। বইটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় এটি অন্যতম আলোচিত নতুন বই হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার স্বতন্ত্র প্রাঞ্জল ও ঋজু ভাষায় এই গ্রন্থে সমকালীন ও পূর্বসূরি সৃজনশীল মানুষদের মূল্যায়ন করেছেন।



