২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে জুলাইয়ে আত্মত্যাগ

শুধু বিচার চায় শহীদ মারুফের পরিবার

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
শুধু বিচার চায় শহীদ মারুফের পরিবার
শুধু বিচার চায় শহীদ মারুফের পরিবার

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ফেসবুকে একটি মন্তব্য করার কারণে ছেলেকে আটক করেছিল ডিবি। সেই ঘটনার পর আতঙ্কিত বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছেলেকে আর ঢাকায় রাখবেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দূরে রাখতে গ্রামের বাড়ি বরিশালে পাঠিয়ে স্কুলে ভর্তি করান। ভেবেছিলেন, রাজধানীর উত্তপ্ত পরিবেশ থেকে দূরে থাকলে অন্তত ছেলেটা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ছয় বছর পর সেই আশাই ভেঙে যায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১৯ জুলাই গণ-আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান একতা ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন। এখন ছেলের স্মৃতি বুকে নিয়ে বাবা শুধু একটি কথাই বলেন, আমার সন্তানের খুনিদের বিচার কার্যকর দেখতে চাই।

শহীদ মারুফ হোসেন ছিলেন পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর থেকেই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হন। তবে সামনের সারিতে নয়, বরং আহতদের পাশে দাঁড়িয়েই নিজের দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলেন।

মারুফের বাবা জানান, ১৮ জুলাই তার ছেলে আন্দোলনের সময় আহতদের সাহায্য করছিল। হাতে টিস্যু নিয়ে আহতদের কাছে ছুটে যেত, রক্ত মুছিয়ে দিত, হাসপাতালে নিতে সহযোগিতা করত। কিন্তু নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাইত না।

১৯ জুলাই সকালেই আবার আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন মারুফ। দুপুরে ফিরে বাবাকে জানান, স্নাইপারের গুলিতে আহত একজনকে অন্যদের সাথে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। তখন বাবা তাকে আর বাইরে না যেতে অনুরোধ করেন। দুপুরে পরিবারের সবাই একসাথে খাবার খান। বাবার ভাষ্য, সেদিন ছেলের মুখে এক ধরনের অজানা বিষণœতা ছিল।

কিন্তু বিকেলের দিকে সবার অগোচরে আবার বাসা থেকে বেরিয়ে যান মারুফ। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তার মা ফোন করলে মারুফ জানান, তিনি ডিআইটি প্রজেক্টের ৪ নম্বর রোডের মাথায় আছেন। ফোনে শুধু বলেছিলেন, মা, আল্লাহ ভরসা, তুমি চিন্তা করো না। সেটিই ছিল মায়ের সাথে তার শেষ কথা।

এর কিছুক্ষণ পর বাড্ডা থানার সামনে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন মারুফ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তার বাবা বলেন, মারুফ তখন একজনের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গুলি লাগার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘আমার কী জানি হয়েছে।’

বাবার ভাষ্যমতে, চিকিৎসকরা পরিবারকে জানান, গুলিটি আগে আরেকজনকে ভেদ করে মারুফের শরীরে ঢুকে পেছনের হাড়ে আটকে ছিল। পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবির এক সদস্যের ছোড়া গুলিতেই তার মৃত্যু হয়েছে।

তবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও শেষ হয়নি পরিবারের দুর্ভোগ। মারুফের বাবা বলেন, প্রথমে তাকে জানানো হয়েছিল ছেলেকে এমজেড হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে না পেয়ে আবার ছুটে যান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে একটি কাগজে সই করানোর পর পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরতে হয়েছে। পুরো দিন কেটে যায় শুধু ছেলের লাশ পেতে অনুমতির অপেক্ষায়।

তিনি জানান, পরদিন মর্গে গিয়েও ছেলের লাশ খুঁজে পাননি। পরে জানতে পারেন, জায়গার সঙ্কটের কারণে কয়েকটি লাশ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রাখা হয়েছে। সেখানে গিয়ে একের পর এক ফ্রিজ খুলেও প্রথমে ছেলেকে চিনতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তলপেটে বাঁধা গামছা এবং পায়ের জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হন, এটাই তার ছেলে মারুফ। লাশ বাসায় নিয়ে গেলে ছেলের মা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। পরে পায়ের জন্মদাগ দেখে ছেলেকে চিনতে পেরে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাড্ডা কবরস্থানে দাফন করা হয় মারুফকে।

তিনি বলেন, আমার তো আর কিছু চাওয়ার নেই। সন্তানকে কোনোদিনই ফিরে পাবো না; কিন্তু যারা আমার নিরস্ত্র ছেলেটার ওপর গুলি চালিয়েছে, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তাদের প্রত্যেকের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই। ছেলেকে হারানোর কষ্টের পাশাপাশি লাশ খুঁজে পেতে আমাকে হাসপাতাল আর থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরতে হয়েছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে?

ইতোমধ্যে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তার দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মারুফের বাবার শোকাহত দীর্ঘশ্বাস- আমার সন্তানের রক্তের বিচারই এখন আমাদের একমাত্র দাবি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে অন্তত মনে হবে আমার ছেলের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।