ঢাকায় দূষণের বিস্তার বাড়ছে

আবুল কালাম
Printed Edition

  • ১০ এলাকা চিহ্নিত
  • ৬ কারণে দূষণ

ঢাকা মহানগরীতে দূষণের বিস্তার আরো বাড়ছে। সময়ের সাথে নতুন নতুন এলাকায় অসহনীয় মাত্রায় দূষণ গ্রাস করছে। ইতোমধ্যে শহরের বেশি দূষিত ১০ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। লাগামহীন দূষণের ছয় কারণ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে নগরবাসীকে ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, গত বছর ডিসেম্বরে ঢাকার সাত স্থানে বায়ুদূষণ বেশি ছিল। কিন্তু তিন মাস না যেতেই তার বিস্তার ১০ স্থানে ছড়িয়েছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পর্যবেক্ষণ ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার সূচক বলছে, গেল বছর ডিসেম্বরে ঢাকার সাত স্থানের বায়ু বেশি দূষিত ছিল। যার মধ্যে ছিল মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং, বেজ এজ ওয়াটার, কল্যাণপুর, দক্ষিণ পল্লবী, গোড়ান, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও শান্তা ফোরাম।

অন্যদিকে চলতি মাসের ৩ তারিখে আইকিউএয়ার এর প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার ১০ এলাকায় বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি, ধানমন্ডি, মাদানী এভিনিউয়ের বেজ এইজ ওয়াটার আউটডোর, মিরপুরের দক্ষিণ পল্লবী, উত্তর বাড্ডার আব্দুল্লাহবাগ এলাকা, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, গুলশান লেকপার্ক, বারিধারা লেক সাইড, পেয়ারাবাগ রেললাইন এলাকা ও খিলগাঁওয়ের গোড়ান।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মূলত এসব এলাকায় ঘনবসতি হলেও মানুষের চলাচলে রাস্তার আকার ছোট। অন্যদিকে সবুজায়নও অনেক কম। অপরদিকে অপরিকল্পিত ইটভাটা, শিল্প-কারখানা, জ্বালানি ও বর্জ্য পোড়ানো, নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ যানবাহনের ধোঁয়া পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যার ফলশ্রুতিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ¯্রােতের গতিতে দূষণ ছড়াচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকার তুলনামূলক কম দূষিত এলাকা হিসেবে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড, আগারগাঁও শিশু হাসপাতাল এলাকা এবং পল্লবীর ডি ব্লকের নাম উঠে এসেছে। বেশি সবুজায়ন ও প্রশস্ত রাস্তার কারণে এসব এলাকায় দূষণ কম বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়, গুলশান লেকপার্ক বা বারিধারা লেকসাইডের মতো সবুজ এলাকাগুলোও শহরের অন্যান্য অংশের তুলনায় কিছুটা ভালো মানের বাতাস সরবরাহ করে। ফলে সেসব এলাকায় এখনো দূষণ অনেক কম।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) বলছে, দিন যত যাচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয় তত বাড়ছে। তার প্রমাণ গেল বছরের জানুয়ারি মাসের বায়ুদূষণ আগের আট বছরের জানুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি ছিল। আর বছরের ফেব্রুয়ারি মাস দূষণের দিক থেকে ছিল শীর্ষে। যা বিগত আট বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ১৬ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৯ বছরের ঢাকায় নির্মল বাতাস ছিল মাত্র ৩১ দিন। বায়ুমান সূচকের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এতে বলা হয়, ঢাকার বাতাসে উচ্চমাত্রায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের অস্তিত্ব মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে, আর্সেনিক, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান। ঢাকার বাতাসে এসব বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ।

এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলছেন, মূলত বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ এই পাঁচ মাসে মূল বায়ুদূষণ ঘটে। এর মূল কারণ চারটি। যার মধ্যে রয়েছে স্থানীয়ভাবে আমাদের ইটভাটা ও শিল্পকারখানাগুলোর নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানোর কাজগুলো শীতে একযোগে শুরু হয়। অন্যদিকে দেশের উত্তর দিক থেকে অর্থাৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ‘ট্রান্স বাউন্ডারি এয়ার পলিউশন’ ও বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর এ সময়ে যেহেতু বৃষ্টিপাত কম থাকে, সবকিছু শুকনা অবস্থায় থাকে, এজন্য বায়ুদূষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

তার ভাষ্য, প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ করে বায়ুদূষণের পরিমাণ বাড়ছে। এর মধ্যে আন্তঃমহাদেশীয় বায়ুদূষণ ৩০ ভাগ, রান্নার লাকড়ি ২৮ ভাগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ভাগ, ইটভাটা ১৩-১৫ ভাগ, নির্মাণকাজ ১১ ভাগ, বর্জ্য পোড়ানো ১১ ভাগ এবং যানবাহন ৫ ভাগ দেশের বাতাসকে দূষিত করছে। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন পরিবহন আর ইটভাটা ঢাকার বাতাসকে দূষিত করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আবদুস সালাম বলেন, বায়ুদূষণ বিশ্বের সব দেশেই কমবেশি আছে। আর যেসব দেশে অনেক বেশি ছিল তারা ইতোমধ্যে তা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে তাদের দেশ বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বিরাজমান অবস্থায় মনে হচ্ছে আমরা ভয়ানক অবস্থার দিকে যাচ্ছি। তার প্রধান কারণ পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। এটা বড় বিপদের আলামত মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না হলে সামনে বড় বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।

আরেক পরিবেশ বিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতির আচরণ বলে দিচ্ছে সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ ধেয়ে আসছে। কারণ এতে করে উচ্চ তাপমাত্রা, ভয়াবহ বন্যা, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। পারিবারিক পর্যায়েও ঝুঁকি বাড়বে বহুগুণ।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে দূষণ যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে মাটি পানি বাতাসে বিষ ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রতিটি ঘরে ঘরে মানুষের বিপদ বাড়ছে। কারণ বায়ু থেকে মানুষের শরীরে যেমন বিষ ছড়াচ্ছে একইভাবে পানি থেকে দূষিত হচ্ছে মাটি। সেই মাটিতে যে ফলন হচ্ছে তাও বিষাক্ত হয়ে মানুষের ঘরে যাচ্ছে এবং খাবারের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সময় থাকতে এর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি তাগিদ দেন।

পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো: জিয়াউল হক বলেন, যেসব কারণে দূষণ হচ্ছে তার সোর্সগুলো খুবই কঠিন। তার ভাষ্য, দেশের বাইরের থেকে আসা ৩৫ শতাংশ দূষণ এগুলো নিয়ন্ত্রণে তাদের হাত থাকে না। অন্যদিকে নির্মাণকাজ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এগুলোতে যেসব সংস্থা কাজ করে তারাও আইন অনুসরণ করছেন না। পোড়ানো কঠিন বর্জ্য, ছড়িয়ে পড়া ধুলো ও ধোঁয়া পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। তাই পরিবেশ আইনে শাস্তির বিধান আরো কঠোর হচ্ছে। যারা নিয়ম মানবেন না তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।