দাদীর বুদ্ধি : নূরুল ইসলাম মনি

Printed Edition
দাদীর বুদ্ধি  :    নূরুল ইসলাম মনি
দাদীর বুদ্ধি : নূরুল ইসলাম মনি

‘আব্বু! আপনার মায়ের এত বুদ্ধি কেন?’ ‘তো? কী হয়েছে? আমার মা কী করেছে?’

‘কিছু করে নাই। আপনার মায়ের বিরাট বুদ্ধি। তাই বললাম।’

‘বুদ্ধি তো থাকবেই। কার মা দেখতে হবে না? আমার মা বলে কথা। আমার মায়ের বুদ্ধি থাকবে না তো কার মায়ের বুদ্ধি থাকবে বলো তো? যেমন বেটা তেমন মা। এটাই তো হওয়ার কথা,তাই না আম্মু?’

এই কথা বলে হি হি করে হাসতে লাগল মিজান। পিচ্চি মেয়ে তমা বাপের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনার মা হলেই যদি এত বুদ্ধি হয় তাহলে আমিও তো আপনার মা। আমার বুদ্ধি কই?’

‘আরে!। তাই তো! তাই তো! তুমিও তো আমার মা! তাহলে তোমার বুদ্ধি কই? বেশ চিন্তার বিষয়। চলো তো তোমার দাদীর কাছে, মানে আমার মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।’

মিজান তার পিচ্চি মেয়েকে সাথে নিয়ে মায়ের কাছে গেল।

মা বিলকিস বানু একজন উচ্চশিক্ষিত গৃহিণী। তিনি গ্রামে থাকেন। শহরের এই বাসা তাদের নিজেদেরই। কিন্তু গ্রামের বিশাল সম্পত্তি, ধান চাল, গরু-বাছুর, কামলা শ্রমিক ইত্যাদি রেখে এই বাসায় এসে তিনি থাকতে পারেন না। বড় ছেলে মিজান একটা ব্যাংকে উচ্চ পদে চাকরি করে এবং বউ আর মেয়ে তমাকে নিয়ে এই বাসায় থাকে।

এই বাসায় বিলকিস বানুর খুব কমই আসা হয়। তাই তার নাতনী তমার সাথে তার খুব একটা মেলামেশা করা হয়ে ওঠে না। আজ কয়েক দিন হয় তিনি এই বাসায় এসেছেন ডাক্তার দেখানোর জন্য।

এই কয়েক দিন দাদীর সাথে মেশার কারণে নাতনীর ধারণা হয়েছে যে, তার দাদী খুব বুদ্ধিমান, খুব চালাক। তার এই ধারণার কথা তার বাবা মিজানের কাছে বলল। তাই মিজান মেয়েকে নিয়ে তার মায়ের কাছে এলো।

মা তখন খুব মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ছিলেন। তমা ডাক দিলো, ‘দাদী! ও দাদী’! দাদী তার চোখের সামনে ধরা বইটা বন্ধ করে জবাব দিলো, ‘কে রে? আমার ভালো বোনটা নাকি? এসো এসো। আমার কাছে এসো।’ তমা বলল, ‘আমার আব্বু এসেছে। তোমার বড় ছেলে। এই দেখো।’ বলে বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো দাদীর কাছে।

মিজান মায়ের কাছে বসে বলল, ‘আপনার নাতনী বলে আপনার নাকি খুব বুদ্ধি। আমি তাকে বলেছি, বুদ্ধি থাকবে না? যেহেতু মা-টা আমার, কাজেই বুদ্ধি থাকতেই হবে।’

‘আমার এই কথার জবাবে সে বলে, দাদী আপনার মা, তাই তার এত বুদ্ধি, আমিও তো আপনার মা, তাহলে আমার বুদ্ধি কই?’

তমার এই প্রশ্নের জবাব জানার জন্য আপনার কাছে এলাম। এখন আপনি বলে দিন আমার মেয়ে তমার বুদ্ধি কোথায়? আমরা তার বুদ্ধি খুঁজে পাই না কেন?’

বিলকিস বানু বললেন, ‘এই কথা! বসো বসো। আমার কাছে বসো। আমি খুঁজে দেখি তমার বুদ্ধি কোথায় আছে।’ তমা দাদীর কোল ঘেঁষে বসল। দাদী তমাকে টেনে নিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে গালে ও কপালে চুমু দিয়ে বলল, পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি তোমার বুদ্ধির খোঁজ। তোমার বুদ্ধি তোমার এই মাথার মধ্যেই আছে। তবে জেগে নেই ঘুমিয়ে আছে। এখন এটিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই তোমার বুদ্ধি হবে আমার বুদ্ধির সমান।’

তমা অবাক হয়ে বলল, ‘তা-ই? বুদ্ধিরও ঘুম পায়? বুদ্ধিও ঘুমায়? আমার বুদ্ধি ঘুমিয়ে আছে? ওটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে? কেমনে জাগাব দাদী?’ দাদী বলল, ‘শুনো, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনো। তুমি যদি বুদ্ধিমান হতে চাও, জ্ঞানী হতে চাও, তোমার ঘুমিয়ে থাকা বুদ্ধিকে জাগিয়ে তুলতে চাও তাহলে তোমাকে পাঁচটা কাজ করতে হবে।’

‘কয়টা কাজের কথা বললাম বুবু?’

তমা বলে, ‘পাঁচটার কথা’। ‘তুমি কি সেই পাঁচটা কাজ করবে’?

‘হ্যাঁ করব। কারণ আমি চাই আমারও বুদ্ধি হোক। ঠিক তোমার মতো। তুমি আব্বুর মা। তোমার এত বুদ্ধি। আমিও তো আব্বুর মা হই। তাহলে আমার বুদ্ধি থাকবে না কেন?’

‘তুমি আব্বুর মা হও?’

‘হ্যাঁ, হই তো’। ‘কে বলেছে?’

‘আব্বু বলেছে’।

‘আব্বু আমাকে বলেছে আমি আব্বুর মা হই। আব্বু আমাকে সব সময় মা বলে ডাকে। তুমি জানো না?’

‘না। আমি জানি না। কেমনে জানব? আমি তো গ্রামে থাকি। তোমাদের এখানে থাকি না। থাকলে তো জানতাম।’

‘না জানলে। এখন তো জানলে। এখন বলো কোন পাঁচটা কাজ করলে আমার বুদ্ধি ঘুম থেকে জেগে উঠবে?’

‘বলছি শুনো তাহলে। সেগুলো

হলো- ১. মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে। ২. সময়মতো খাওয়া দাওয়া করবে। ৩. দোকানের জিনিস কিনে

খাবে না। ৪. দৈনিক দুবার সুন্দর করে দাঁত মাজবে। ৫. বাবা-মায়ের কথা মেনে

চলবে।

এই পাঁচটি কাজ যদি তুমি করতে পারো তাহলে দিনে দিনে তোমার ঘুমিয়ে থাকা বুদ্ধিগুলো জেগে উঠবে। তুমি বুদ্ধিমান বা জ্ঞানী হয়ে উঠবে। এগুলো পারবে না বুবু?’

‘পারব দাদী পারব’।

‘তাহলে তোমার আব্বুকে সাক্ষী রেখে আমার হাত ধরে কথা দাও, আজ থেকে তুমি এই পাঁচটি কাজ করা শুরু করবে।’ তমা তার দাদীর হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করল, আজ থেকে সে তার দাদীর বাতলানো কাজগুলো সঠিকভাবে করবে।