দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে লোকসংস্কৃতি চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’। সংগঠনটির উদ্যোগে দুই জেলায় প্রায় ছয় শতাধিক শিশু লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্র চর্চায় যুক্ত হয়েছে, যা ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বাংলা লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে ২০১৬ সালে নরওয়ের নাগরিক কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের উদ্যোগে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের দেওডোবা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মায়ের তরী’। পরবর্তীতে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সিংহীমারী গ্রামেও এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।
সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে বর্তমানে দুই জেলায় ৯টি ‘গুরুগৃহ’ পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে প্রায় ৪৬০ জন শিশু নিয়মিত লোকগান শিখছে। পাশাপাশি দুটি বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২৫ জন শিক্ষার্থী দোতারা, একতারা, তবলা, বাঁশি, সারিন্দা, খমোকসহ বিভিন্ন লোকবাদ্যযন্ত্রে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ ছাড়া ‘তরীর ক্লাস’ নামে একটি বিশেষ কার্যক্রমে ১৫ জন শিক্ষার্থী প্রতি মাসে দিনব্যাপী লোকসঙ্গীতের নিবিড় প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। প্রতিটি গুরুগৃহে অভিজ্ঞ গুরুরা নিজ নিজ বাড়িতে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান করেন।
এখানে শিশুরা লালনগীতি, মারফতি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া ও পল্লিগীতিসহ বিভিন্ন ধারার লোকসঙ্গীত শিখছে। আধুনিক ও ব্যান্ডসঙ্গীতের প্রভাবের মাঝেও এমন উদ্যোগ স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
সংগঠনের সাথে যুক্ত লেখক ও গবেষক ইউসুফ আলমগীর বলেন, ‘আমরা শুধু সঙ্গীত শেখাই না, শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ করছি। ‘মায়ের তরী’ একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন।’
সংগঠনটির পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, উয়েরা সেথ ১৯৯৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন এবং উত্তরাঞ্চলের সংস্কৃতি কর্মীদের নিয়ে এই উদ্যোগের সূচনা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি ও সমাজের অস্থিরতার মধ্যে লোকসঙ্গীত মানুষকে শান্ত ও মানবিক করে তোলে। এই চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখাই আমাদের লক্ষ্য।’



