অনলাইন হয়রানিতে ফিকে হচ্ছে কৈশোর

ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের জীবনকে গতিশীল করলেও কিশোর-কিশোরীদের জন্য তা এক অন্ধকার জগতও উন্মোচন করেছে। অনলাইন হয়রানি বা ‘সাইবার বুলিং’ বর্তমানে বাংলাদেশের কিশোর প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার উদ্বেগজনক তথ্য বলছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার সাধারণের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের জীবনকে গতিশীল করলেও কিশোর-কিশোরীদের জন্য তা এক অন্ধকার জগতও উন্মোচন করেছে। অনলাইন হয়রানি বা ‘সাইবার বুলিং’ বর্তমানে বাংলাদেশের কিশোর প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার উদ্বেগজনক তথ্য বলছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিষণœতার হার সাধারণের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

আঁধারে ঢাকা স্বপ্ন : ভুক্তভোগীদের জবানবন্দী

দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তারের (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা শিউরে ওঠার মতো। পহেলা বৈশাখের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পর একটি ভুয়া আইডি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অও ব্যবহার করে তার আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়। শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ দাবি। লোকলজ্জার ভয়ে শুরুতে পরিবারকে না জানালেও মানসিক চাপ সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি সব খুলে বলেন। বর্তমানে ফারজানা তীব্র মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন।

একইভাবে কিশোর আরিফুল ইসলাম জানায়, দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটানোর ফলে বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হতে হয় তাকে। এর ফলে সে এখন একাকিত্ব ও তীব্র বিষণœতায় ভোগে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তার পড়াশোনা ও প্রাত্যহিক কাজে।

গবেষণার ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান

ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে (ইগঔ) প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের অর্ধেকেরও বেশি জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

৫৩% শিক্ষার্থী অনলাইন গ্রুমিং বা ফাঁদে পড়ার শিকার।

৩৮% সাইবার ফ্ল্যাশিং বা অযাচিত নগ্ন ছবি পাঠানোর শিকার।

১২% সেক্সটোরশন বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার।

বিবিএসের ২০২৫-২৬ সালের আইসিটি জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৬.২ শতাংশ পরিবার এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। প্রযুক্তির এই ব্যাপক প্রসার কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকির মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব

অনলাইন হয়রানির প্রভাব কেবল পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোররা তীব্র উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সাধারণের চেয়ে চার গুণ বেশি থাকে। ‘অ্যাসোসিয়েশন অব সাইবারবুলিং অ্যান্ড ডিপ্রেশন’-এর তথ্য মতে, ভুক্তভোগী প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে একজন গুরুতর বিষণœতার উপসর্গ নিয়ে জীবনযাপন করে। ‘মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার’ (গউউ) গবেষণায় দেখা গেছে, ১২.৪ শতাংশ ভুক্তভোগী কিশোরী ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের শিকার।

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনলাইন হয়রানির শিকার অধিকাংশ ব্যক্তিই কাছের মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হন। লোকলজ্জা আর ভয়ভীতির কারণে ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ আইনের আশ্রয় নেয় না। প্রায় ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগী মনে করেন যে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। ফলে অপরাধীরা পর্দার আড়ালে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও উত্তরণের পথ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জোবেদা খাতুন বলেন, ‘কৈশোরে আবেগ থাকে তীব্র। সামাজিক অপমান বা প্রত্যাখ্যান তাদের খুব বেশি কষ্ট দেয়। পারিবারিক সমর্থন না থাকলে তারা চরম একা হয়ে পড়ে, যা তাদের আত্মঘাতী করে তুলতে পারে।’

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিং মোকাবেলায় কিছু পদক্ষেপ জরুরি :

১. পাল্টা আক্রমণ নয় : বুলিংয়ের শিকার হলে আবেগের বশবর্তী হয়ে পাল্টা আক্রমণ করা উচিত নয়।

২. প্রমাণ রাখা : কোনো কমেন্ট বা ছবি ডিলিট করার আগে সেটির স্ক্রিনশট বা ডিজিটাল প্রমাণ রাখা আইনি লড়াইয়ের জন্য জরুরি।

৩. রিপোর্ট ও ব্লক : সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দ্রুত রিপোর্ট করা এবং হয়রানিকারীকে ব্লক করা।

৪. শেয়ার করা : নিজের মধ্যে চেপে না রেখে মা-বাবা, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কাউকে বিষয়টি জানানো।

সরকারের উদ্যোগ : বিশেষ সেল গঠন

নারী ও শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি ‘বিশেষ সেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, এই সেল নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। শিক্ষার্থী পর্যায় থেকে শুরু করে কর্মজীবন পর্যন্ত সর্বস্তরের হয়রানি বন্ধে সরকার এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

উপসংহার : ডিজিটাল জগতকে নিরাপদ করতে কেবল আইনি কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা এবং কিশোর-কিশোরীদের সঠিক মানসিক দিকনির্দেশনা। অন্যথায়, প্রযুক্তির এই করাল গ্রাসে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক প্রশান্তি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।