রংপুর ব্যুরো
সাম্প্রতিক ঝড়, শিলাবৃষ্টি আর কালবৈশাখীতে দেশ-বিদেশে সমাদৃত জিআই পণ্য হাঁড়িভাঙ্গা আমের গুটি ঝড়ে পড়েছে ৩০ ভাগেরও বেশি। আঁটি আসার ঠিক আগ মুহূর্তে গুটি ঝরে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন নিজস্ব ও লিজি বাগানমালিকরা। ন্যায্য দাম না পেলে চাষিদের ধকল কাটাতে হবে বছরে পর বছর। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, গত ২৬ ও ২৭ এপ্রিলের শিলাবৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়ায় হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানী খ্যাত রংপুরের পদাগঞ্জ ও আশপাশের সব বাগান থেকেই ঝড়ে গেছে টনকে টন আম। অনেকেই এসব কুড়িয়ে বস্তাভর্তি করে ঢাকায় পাঠচ্ছেন আত্মীয়স্বজনের বাসায়। অনেক আম এখনো পড়ে আছে মাটিতে। অনেক বাগানে এখনো পানি।
মিঠাপুকুরের তেকানী গ্রামের হাঁড়িভাঙ্গার মাতৃগাছের মালিক মরহুম নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেনের জানান, এবার আল্লাহ আম দিছিল যথেষ্ট। আমরা যতœও ভালো করলাম। কিন্তু কয়েক দিনের ঝড়ে যে বড় ক্ষতি হয়েছে। বড় বড় পাথরসহ বৃষ্টি হইছে। এতে অন্তত ৫ ভাগ আম পড়ে গেছে। এখন যে অবস্থা আল্লাহ যদি দয়া করে আর ঝড়-বাদল না দেন তাহলে হয়তো কিছু ফলন পাওয়া যাবে। আর যদি দাম না হয় তাহলে আমরা মাঠে মারা যাবো।
তার মতোই দশা রুকুনিগঞ্জ গ্রামের চাষি মিন্টু মিয়ার। তিনি বলেন, আমার এক একর বাগানে আড়াই শ’ গাছ আছে। আশা ছিল ৪০০ মণ আম হবে। কিন্তু বাতাস আর শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ১০০ মণের মতো আম শেষ। আর যদি দু-চার দিন এমন বাতাস হয়, তাহলে পুরোটাই শেষ হয়ে যাবে। ঝড়ে যাওয়া এসব আমে আর ১৫ দিন পর আঁটি হতো। তখন ঝরে গেলে কিছু বিক্রি করা যেত। আমি ধারদেনা করে এরই মধ্যে এক লাখ টাকা খরচ করেছি। ওষুধের দোকানে ৫০-৬০ হাজার টাকা বাকি আছে। এবার দাম না পেলে ফতুর হয়ে যাবো।
নিজস্ব বাগানমালিকদের চেয়ে ইজারা নেয়া চাষিদের অবস্থা আরো কাহিল। খোড়াগাছের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মমদেল হোসেন বলেন, আমি প্রায় ৩৫ একর জমি ইজারা নিয়েছি দুই, তিন ও চার বছরের জন্য। এ বাবদ প্রায় ৭০ লাখ টাকা লগ্নি করেছি। এবার বাগানের আমগুলো এই পর্যন্ত আনতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। কিন্তু আঁটি আসার আগেই চারবার ঝড় শিল-পাথরের মুখে পড়ল। মনে করেছিলাম এবার আমার পাঁচ হাজার মণ হবে, দাম ভালো পেলে চার বছরের ইজারার টাকা দুই বছরেই উঠবে। বাকি বছরগুলোর পুরোটাই লাভ হবে। কিন্তু ঝড়ে দুই হাজার মণেরও বেশি আম একদম পড়ে গেছে।
ঝড়ে হাঁড়িভাঙ্গা আম শুধু ঝরেই যায়নি, শিলাবৃষ্টিতে ফেটে যাওয়া, ফুটো ও দাগ হওয়া যেসব আম এখনো গাছে আছে তার পরিমাণও অনেক। সেগুলো কিছু দিনের মধ্যেই ঝরে যাবে।
পরিদর্শনকালে সাক্ষাৎ হয় অনলাইনে হাঁড়িভাঙ্গা আম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সতেজ টিমের সাথে। তাদের প্রধান আসাদুজ্জামান রিফাত জানান, আমরা প্রতিনিয়ত বাগান ভিজিট করি। গত দুই দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে বাগানে এসে দেখলাম অনেক আম ঝরে গেছে। ফলে এবার বেশি দামে আম কিনতে ও বিক্রি করতে হবে।
তবে বাগান মালিক চাষি ও ব্যবসায়ীরা যখন এ কথা বলছেন, তখনো আশার কথা শুনিয়েছে কৃষি বিভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুর জোনের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষকদের বলি আম পাতলা করে দেয়া বা থিনিং করতে, অনেকে সেটি করতে চান না; যে কারণে একটি ঝোপায় আম থাকলে সেগুলোর আকার ছোট হয়ে যায়। তাই যে কাজটি চাষিরা করেন না, এবার প্রকৃতি কিছুটা হলেও সেই থিনিং করে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আম আকারেও বড় হবে। ফলে এখন পর্যন্ত যে অবস্থায় আছে আমরা সেগুলোকে ফলে রূপান্তর করতে পারলে ফলনে কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না।
এ দিকে আবহাওয়া অফিসও বলছে নতুন করে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা কম।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, যেহেতু বেশ কয়েক দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাত হেেয়ছে তাই আবার শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত নেই।
পায়রায় ৩ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত বহাল
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য অব্যাহত থাকায় পটুয়াখালীসহ দেশের অন্তত ৯ জেলার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে এবং সমুদ্রবন্দরগুলোতে সতর্ক সঙ্কেত বহাল রাখা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সাগরে সৃষ্ট বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে উপকূলীয় এলাকায় বজ্রমেঘের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পটুয়াখালী জেলায় গত দুই দিন ধরে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। খেপুপাড়া আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সকাল ৯টা থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কলাপাড়ায় ১২০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এ দিকে উপকূলীয় অঞ্চলে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। নদ-নদীর পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে, যা মৎস্যজীবী ও নৌযান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করছে।
আবহাওয়া অফিস আরো জানিয়েছে, বায়ুচাপের এই তারতম্যের প্রভাবে পটুয়াখালীসহ দেশের ৯ জেলার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় সব নৌযানকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সাথে চলাচল করতে এবং মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনও উপকূলবাসীকে অপ্রয়োজনীয় বাইরে বের না হওয়ার এবং আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে।



