আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিলেন মিটফোর্ড হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী। নেতা ও মন্ত্রীদের আর্শীবাদে বাদলি হয়ে চলে যান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তবে সেখানে উচ্চমান সহকারী নন, পদায়ন হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি প্রশাসনিক কর্মকর্তা-১ রেজাউল ইসলামকে।
উপপরিচালকের আর্শীবাদ নিয়ে নেমে পড়েন টেন্ডার বাণিজ্য, ট্রেনিংয়ের টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়মে। বছরের পর বছর চলতে থাকে তার এমন দুর্নীতি অনিয়ম। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে গেলেও বহাল তবিয়তে থাকেন রেজাউল। অব্যাহত থাকে তার একই কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে বদলির আদেশ হলেও চেয়ার ছাড়েননি তিনি। অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীকে দিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তার বদলি আদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নিয়েছেন তিনি। এই ঘটনার পর থেকে দেশের সব থেকে বড় সেবাদান কেন্দ্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলছে তীব্র অসন্তোষ। তার বদলির পক্ষে-বিপক্ষে চলছে বিক্ষোভ। এমনকি পরিচালককে অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটছে, যা নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ।
সূত্রমতে গত ২৮ জুলাই ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: রেজাউল ইসলাম ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মোজ্জাম্মেল হককে বদলির আদেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয় ওই প্রজ্ঞাপনে। অন্যথায় চতুর্থ কর্মদিবস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে ঢাকা মেডিক্যালে চলে আসেন। কিন্তু ঢামেকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল চেয়ার না ছাড়ায় কাজে যোগদান করতে পারেননি তিনি। আর এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই গত ১০ আগস্ট বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে রেজাউলকে স্বপদে রাখা হয়। এসব বিষয় নিয়ে গত কয়েকদিন ঢাকা মেডিক্যালে চলছে চরম উত্তেজনা। রেজাউলের বদলির আদেশ প্রত্যাহারের বিরোধিতা করেন পরিচালককে অবরুদ্ধ করেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। আবার রেজাউলের বদলির আদেশের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করে কর্মচারীরা। প্রশ্ন উঠেছে কোন অদৃশ্য কারণে বদলির প্রজ্ঞাপন হলো এবং ১৩ দিনের মাথায় সেটি বাতিল করা হলো। তবে কি নেপথ্যে রয়েছে লেনদেন, নাকি কোনো সিন্ডিকেট?
জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি নিয়ে দু’টি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এক গ্রুপের দাবি- ‘হাসপাতালের টেন্ডার বাণিজ্য, বিশেষ ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দেয়া, হাসপাতালের কেনাকাটা, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ট্রেনিংয়ের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎসহ বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী রেজাউল ইসলামকে বহাল রাখার চেষ্টা করছেন। কারন প্রসাশনিক কর্মকর্তা হিসেবে তার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা হাতিয়ে নিতে পারেন বিপুল অঙ্কের টাকা। এই সিন্ডিকেটে ডান হাত হিসেবে রেজাউল পূর্ণ সহযোগিতা করে আসছেন হাসপাতাল উপপরিচালক ডা: আশরাফুল আলমসহ কয়েক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালক আশরাফুল আলম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ছিলেন ছাত্রলীগের সহসভাপতি। তার দাপটে ভিন্নমতের কেউ মুখ খুলতে পারেননি। সেই আশরাফুল আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতনের আর্শীবাদে ঢাকা মেডিক্যালের উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের অভিযোগ, উপপরিচালক ও প্রসাশনিক কর্মকর্তার যোগসাজশে হাসপাতালের কেনাকাটা থেকে শুরু করে টেন্ডার দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম হয়ে থাকে। দু’জনের যোগাযোগ এতটাই গভীর যে কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। তারা বলেন, প্রতি অর্থবছরে কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির জন্য ট্রেনিং করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বরাদ্দ আসে। একই কাজে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে আসে আরো প্রায় আড়াই কোটি টাকা। অভিযোগ, নামমাত্র কয়েকজনকে ট্রেনিং দিয়ে বাকি টাকা নিজেরাই স্বাক্ষর করে আত্মসাৎ করে আসছেন। এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ও উপপরিচালকের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তার কেউ ফোন রিসিভ করেননি তারা।
স্বাস্থ্য সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসনিক কোনো বিষয়ে যখন সমস্যা দেখা দেয় তখন তার মীমাংসা করতে হয়। এ বিষয়টি আমরা সিনিয়রা বসে একটি মীমাংসা করে দিয়েছি, আর কোনো সমস্যা হবে না, আশা করা যায়। তবে অভিযোগগুলো মন্ত্রী মহোদয়কে জানিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


