নতুন আতঙ্কের নাম এআই ফাঁদ

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

  • অনলাইনে ছবি হয়ে উঠতে পারে বিপদের কারণ
  • অপতথ্যের ফাঁদে বেশি ফাঁসছেন নারীরা
  • রাজনীতিবিদ থেকে তারকা রেহাই পাচ্ছেন না কেউই
  • তিন মাসে ২০২৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে ব্যক্তিগত ছবির ডিজিটাল কারসাজির অপরাধ বর্তমানে ভয়ানক রূপ নিয়েছে। ডিজিটাল যুগে তথ্যের গতি যত দ্রুত, অপতথ্যের বিস্তারও ততটাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তি, সুশীল সমাজ, মিডিয়ার তারকাসহ সব পেশার মানুষ রেহাই পাচ্ছেন না। কখনো তাদের বক্তব্য বিকৃত করা হচ্ছে, কখনো পুরনো বা ভিন্ন প্রসঙ্গের ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে নতুন গল্প তৈরি করা হচ্ছে। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন নারীরা। ফলে তথ্যপ্রবাহের এই ভিড়ে নারীদের ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি, বিতর্ক এবং নেতিবাচক বয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাইবার বুলিং ও হত্যার হুমকির শিকার হয়ে অনেকেই আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছেন।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডাব্লিউ) তথ্য মতে, কনা (ছদ্মনাম) নামের একজনের গোপনে ধারণকৃত তার কিছু গোসলের ছবি কে বা কারা তারই নামে খোলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ফেক আইডি থেকে তাকে পাঠিয়েছে। সে ছবিগুলো ডিলিট করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। ভুয়া আইডির পরিচালনাকারী কনাকে জানায় এসব ছবি সে ডিলিট করে দিতে রাজি আছে যদি কনা নিজের আরো কিছু আপত্তিকর ছবি এবং ভিডিও নিজে ধারণ করে তাকে পাঠায় কিংবা বড় অঙ্কের টাকা দেয়।

এই প্রস্তাবে কনা রাজি না হয়ে আইনি আশ্রয় নেয়ার কথা জানায়। এতে অপরাধী ক্ষিপ্ত হয়ে কনার গোসলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। পরে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করে ও পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করে। পরে জানা যায়, অভিযুক্ত তার প্রতিবেশী ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নারী জানান, সাইবার বুলিং, হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করে তার এবং পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে অপমানজনক বক্তব্য ছাড়াও হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর হুমকিও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে এবং বাসার ঠিকানাও জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা তার এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ। গত তিন মাসে অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত রিউমর স্ক্যানার মোট ২০২৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। বিশ্লেষণে বলছে, এর মধ্যে ৪৭২টি ভুল তথ্যই নারীদের কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে যা মোট শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের প্রায় ২৩ শতাংশ। এসব ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই নারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে অন্তত তিনজন নারী প্রার্থী গত তিন মাসে ২৬টি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন।

রিউমর স্ক্যানার তথ্য মতে, ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ডাকসু সদস্য ও ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা তিন মাসে ২৬টি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অপতথ্যের প্রায় ৩৮ শতাংশই ছড়িয়েছে গণমাধ্যমের নাম-লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা নকল ফটোকার্ডের মাধ্যমে। তা ছাড়া পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে গত তিন মাসে ১২৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ পোস্টেই তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন সময় তার নেতাকর্মীরা ছবি বা ভিডিও ও অডিও বার্তা প্রকাশ করে তার বলে চালিয়ে দিচ্ছে।

রিউমর স্ক্যানার গত তিন মাসে ৪৭টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ ১৭টি ঘটনায় নারীদের জড়িয়ে দাবি প্রচার করা হয়েছে। এসব সাম্প্রদায়িক অপতথ্য সাধারণত বাংলাদেশ ও ভারত- এই দুই দেশকেই ঘিরে ছড়ানো হয়। রিউমর স্ক্যানারের পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, নারীদের জড়িয়ে ছড়ানো এসব সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রায় ৮২ শতাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে ছড়ানো ভুয়া তথ্য বা অপতথ্যের অন্যতম বড় শিকার হয়ে উঠেছেন বিনোদন জগতের নারী তারকারা। তাদের নাম, পরিচয় এবং ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে- যার সিংহভাগই ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক তিন মাসে বিনোদন জগতের ১৫ জন নারী তারকাকে জড়িয়ে অন্তত ১৮টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ শতাংশ অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ করা হয় না। আইনি সহায়তার অভাবে ২৫ শতাংশ, হয়রানির ভয়ে ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ১৭ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না।

পুলিশ সদরদফতর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৬৪২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অভিযোগকারীই পরবর্তীসময়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেয়া ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে ‘জাতীয় এআই নীতিমালা (২০২৬-৩০)’-এর খসড়া তৈরি করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির কণ্ঠ, অবয়ব বা অঙ্গভঙ্গি এআই দিয়ে বিকৃত করে হেয় করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নারী বা অপ্রাপ্তবয়স্কের সম্মতি ছাড়া এআই-জেনারেটেড পর্নোগ্রাফি তৈরি, প্রচার বা আদান-প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ডিপফেক কনটেন্ট ছড়ানোকেও অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এআই প্রযুক্তি কতটা ভয়ঙ্কর তা চিন্তাও করতে পারবেন না। বিশেষ করে নারীদের জন্য নানা ধরনের এআই টুলস ব্যবহার করে মুহূর্তেই একজন নারীর স্বাভাবিক ছবি-ভিডিও পরিবর্তন করে ‘নগ্ন’ ছবি-ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। যা দেখতে প্রায় আসলের মতো। আগে যেখানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বিশাল কম্পিউটার আর প্রোগ্রামার দরকার হতো, এখন সেখানে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও ফ্রি অ্যাপ দিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ভুয়া ভিডিও বানাতে পারেন।

ডিপফেক হচ্ছে এমন এক ধরনের এআই প্রযুক্তি, যা ‘ডিপ লার্নিং’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কারো মুখ, কণ্ঠ বা অঙ্গভঙ্গি অন্য ভিডিওর সাথে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দিতে পারে। মাত্র কয়েকটি সহজ মোবাইল অ্যাপ দিয়েই এটি করা সম্ভব। আমরা অনেকেই শখের বসে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড করি। অথচ আমাদের ধারণাও নেই এই ছবি কতটা ক্ষতির কারণ হতে পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন লিঙ্কে না বুঝেই ক্লিক করা যাবে না। এতে করে মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে যখন কেউ অভিযোগ করলে সাইবার টিম এগুলো নিয়ে তদন্ত করে। এর জন্য ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে। তা ছাড়া ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার ও সিটিটিসির সাইবার ইউনিট রয়েছে। এগুলোতে কেন ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দেয়ার সাথে সাথে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। যে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে অভিযোগ দিতে পারেন। পুলিশ এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে।

পুলিশ সদর দফতর জানায়, ভুক্তভোগীদের প্রতি অনুরোধ, সাইবার জগতে কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই আপনারা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাবেন। অভিযোগ না পেলে পুলিশের পক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। যদি থানায় অভিযোগ জানাতে না চান তবে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) অভিযোগ জানাবেন। পিসিএসডব্লিউতে ভুক্তভোগী নারীদের সেবায় নারী পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কেউ কারো ছবি-ভিডিওর কারসাজি বা কেউ কারো ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দিলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ।