ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কে ম্যানহাটনের একটি আদালতে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদেরকে আদালতে নেয়ার নাটকীয় ছবি প্রকাশ করেছে বিবিসি। ছবিতে দেখা গেছে, মাদুরোকে হাতকড়া পরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের পাহারায় ছিলেন সশস্ত্র কর্মকর্তারা।
মাদক পাচার ও অস্ত্রসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নিউ ইয়র্কের আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিস্তারিত পড়ে শোনানো হবে এ দিন। আদালতে নেয়ার আগে ম্যানহাটনে একটি হেলিকপ্টার থেকে কড়া পাহাড়ায় নামানো হয় মাদুরো ও তার স্ত্রীকে। এ সময় মাদুরোকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়। গত শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের পর নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের কারাগারে রাখা হয়। সেখান থেকেই গতকাল সোমবার তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলো।
আরো হামলার হুমকি ট্রাম্পের : যুক্তরাষ্ট্র যা চায়, ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার যদি সে অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেয় তাহলে দেশটিতে আবারো হামলা চালানোর সম্ভাবনা আছে বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, ভেনিজুয়েলা তাদের তেলশিল্প উন্মুক্ত করা ও মাদক পাচার বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা না করলে তিনি দেশটিতে আরেকটি হামলা চালানোর আদেশ দিতে পারেন। ট্রাম্প কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়ে বলেছেন, কিউবার কমিউনিস্ট শাসন ‘নিজে থেকেই পতনের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে’।
রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ মন্তব্যের বিষয়ে ওয়াশিংটনের কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসার পর থেকে ভেনিজুয়েলা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসার ব্যাখ্যায় ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রসহ বেশ কিছু অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়, সেসব ফৌজদারি অভিযোগের জবাবদিহি করার জন্যই আইনি পদক্ষেপ হিসেবে তাকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে।
মাদুরো (৬৩) কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন। তার বিচার শুরু হতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প নিজে অন্যান্য বিষয়ের ভূমিকা থাকার কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিযান চালানোর মূলত কারণ হচ্ছে ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী অভিবাসীদের ঢল এবং কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণœ করে দেশটির তেলসম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত করার সিদ্ধান্ত। রোববার ফ্লোরিডা থেকে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরার সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যা চুরি করেছে আমরা তা ফেরত নিচ্ছি’। তিনি জানান, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলায় ফিরবে তার পর দেশটির পেট্রোলিয়াম শিল্প পুনর্নির্মাণ করবে। তিনি বলেন, ‘তারা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে আর তারা ভূগর্ভ থেকে তেল উত্তোলন করবে।’
‘সহযোগিতার’ ইঙ্গিত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের : ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার পর দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস প্রথমে এ ঘটনার নিন্দা করলেও পরে সুর নরম করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। রয়টার্স লিখেছে, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের শনিবারের অভিযানকে প্রথমে ‘সম্পদ চুরির অবৈধ চেষ্টা’ বলে সমালোচনা করেছিলেন রদ্রিগেস। তিনি মাদুরোর মুক্তিও দাবি করেন। তবে রোববার রদ্রিগেস সংহতির সুরে যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ কাজ করা এবং সম্মানজনক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে রদ্রিগেস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে টেকসই সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান জোরদার করতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ভেনিজুয়েলার সাথে একটি সহযোগিতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের জনগণ এবং এ অঞ্চল যুদ্ধ নয়- শান্তি ও সংলাপের দাবিদার। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে অত্যন্ত বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত রদ্রিগেস বর্তমানে দেশটির তেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি না মানলে রদ্রিগেসকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।’ এই হুমকির পরই রদ্রিগেসের কাছ থেকে সহযোগিতার ওই ইঙ্গিত এল। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প সাফ জানিয়েছিলেন, ভেনিজুয়েলা যদি তাদের তেলশিল্প উন্মুক্ত করা এবং মাদক পাচার বন্ধে সহযোগিতা না করে, তবে তিনি দেশটিতে আবারো হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।
২০২০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিল। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভেনিজুয়েলার অভিবাসী ইস্যু এবং কয়েক দশক আগে দেশটির মার্কিন তেলসম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশোধ হিসেবেই ট্রাম্প এই চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন।



