মুহা: আবদুল আউয়াল
দুই বছর আগে যে রক্ত ঝরেছিল রাজশাহীর রাজপথে, সেই রক্তের দাগ মুছে গেছে অনেক আগেই। ভেঙে পড়া ব্যারিকেড সরিয়ে নিয়েছে সিটি করপোরেশন, ক্ষতচিহ্ন হারিয়েছে দেয়ালও। কিন্তু সাকিব আঞ্জুমের ঘরে এখনো বিছানাটি আগের মতোই গুছিয়ে রাখা। আলী রায়হানের পরিবার আজও দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলে এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে করে হয়তো সে ফিরে এসেছে।
দুই বছরে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। সরকার বদলেছে, প্রশাসনে এসেছে পরিবর্তন, তদন্ত এগিয়েছে, চার্জশিট জমা পড়েছে। কিন্তু যাদের সন্তান আর কোনোদিন ফিরবে না, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো একই, বিচার হবে কবে?
রাজশাহীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া ৩০টি মামলার এখনো বিচারাধীন। ২১টি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেও বেশির ভাগ বিচারকাজ শুরুই হয়নি বা প্রাথমিক ধাপেই রয়েছে। তদন্ত, চার্জশিট ও আদালতের দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে শহীদ পরিবারগুলোর প্রতীক্ষা আরো দীর্ঘ হয়েছে।
রক্তাক্ত সেই বিকেলের পর
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আলুপট্টি এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে শহরের কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহ মখদুম কলেজ এলাকায় পৌঁছানোর পর আন্দোলনকারীদের সামনে অবস্থান নেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ। অভিযোগ ওঠে, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। সেই সংঘর্ষেই প্রাণ হারান বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম। গুরুতর আহত হন রাজশাহী কলেজর শিক্ষার্থী আলী রায়হান। তিন দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ৮ আগস্ট তিনিও মারা যান।
এই দুই তরুণের মৃত্যু রাজশাহীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীকী ঘটনায় পরিণত হলেও দুই বছর পরও তাদের হত্যার বিচার দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এক গ্লাস পানির স্মৃতি আজও তাড়া করে
সে দিন সাকিবকে আশ্রয় দিয়েছিলেন আসনা খাতুন। দুই বছর পরও সেই কয়েক মিনিটের স্মৃতি তার কণ্ঠ ভারী করে দেয়। তিনি বলেন, ‘সাকিব গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বাসায় ঢুকে শুধু এক গ্লাস পানি চেয়েছিল। পানি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার শেষ মুহূর্তটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই দৃশ্য ভুলতে পারিনি। কিন্তু এখনো বিচার দেখতে পেলাম না।’ আসনার প্রশ্ন, ‘যদি এমন একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারই এত দীর্ঘ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখবে কিভাবে?’
একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের নাম সাকিব
ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব আঞ্জুম। পরিবারের বিশ্বাস ছিল, একদিন বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে নিজের ক্যারিয়ার গড়বেন। কিন্তু তা আর হলো না।
মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাবো না। কিন্তু বিচারটা দেখে যেতে চাই। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় সান্ত¡না হবে খুনিদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা।’
বাবা মাইনুল ইসলামের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ।
‘আমরা প্রতিশোধ চাই না। শুধু চাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। অপরাধীরা শাস্তি পাক। কিন্তু দুই বছরেও- সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না।’
আলী রায়হানের পরিবারের অপেক্ষা
আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। অথচ শহীদ পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, দ্রুত বিচার- এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিচার বিলম্বিত হলে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
কেন থমকে আছে বিচার?
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিচার বিলম্বের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী; বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও যাচাই করতে সময় লেগেছে; ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণ জটিল ছিল; একাধিক মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামি থাকায় তদন্ত দীর্ঘ হয়েছে; অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ পলাতক থাকায় তদন্ত ও বিচার উভয় প্রক্রিয়াই ধীর হয়েছে।
আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এত বড় পরিসরের ঘটনায় তদন্তের ক্ষেত্রে নিভুলতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অযথা দীর্ঘসূত্রতাও ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা।
পুলিশ কী বলছে?
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির জানান, ৩০টি মামলার মধ্যে ২১টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। আরো দু’টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, তথ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করছি। এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। ছয় শতাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
আরএমপি কমিশনার বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। রাজশাহীতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এ-সংক্রান্ত মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে আরএমপি আন্তরিকভাবে কাজ করছে।’
তদন্ত শেষ, কিন্তু আদালতে গতি কম
তদন্ত এগোলেও বিচারিক পর্যায়ে গতি আসেনি। রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আলী আশরাফ মাসুম জানান, দীর্ঘ দিন মহানগর দায়রা জজের পদ শূন্য থাকায় অনেক মামলার বিচার শুরু করা যায়নি। বর্তমানে বিচারক নিয়োগ হওয়ায় শুনানি শুরু হয়েছে। তবে বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারক সঙ্কট, মামলার চাপ এবং সাক্ষ্য গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে দ্রুত রায়ে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আলোচিত হত্যা মামলা
সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেখানেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’
বিচারের কাঠগড়ায় কারা?
রাজশাহীর অধিকাংশ মামলায় আসামি হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রাজশাহীর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। কয়েকটি আলোচিত হত্যা মামলায় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দাখিল হয়েছে।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাস শুধু আন্দোলনের সাফল্য দিয়ে লেখা হয় না; লেখা হয় সেই আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষের প্রতি রাষ্ট্র কতটা দায়বদ্ধতা দেখিয়েছে, তার ভিত্তিতেও।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর শহীদ পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় দাবি কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা- স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ বিচার।
রাজশাহীর বহু পরিবার তাই এখনো প্রতিদিন অপেক্ষা করছে একটি রায়ের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য।



