সাক্ষাৎকার : ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির

জাতীয় সরকার না হলে গন্তব্য ব্যাহত হবে জুলাইয়ের

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল জাতীয় সরকার গঠন না করা। দ্বিতীয় বড় ভুল হচ্ছে একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত। তার মতে, দেশে সেই পরিমাণ লোকবল, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নেই, যার মাধ্যমে একই দিনে দুটি বড় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির বলেছেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল জাতীয় সরকার গঠন না করা। দ্বিতীয় বড় ভুল হচ্ছে একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত। তার মতে, দেশে সেই পরিমাণ লোকবল, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নেই, যার মাধ্যমে একই দিনে দুটি বড় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।

নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে সুপরিকল্পিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র চলছে। পুরনো দুর্নীতিবাজ আমলাচক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নতুন করে আঁতাত করে ক্ষমতায় যেতে চাইছে। তিনি বলেন, দেশে নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম’ তুলে দেয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার কাছে সন্তানের চেয়েও দেশ বড় ছিল। তার রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ না করলে কোনো রাজনৈতিক দলই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। ‘আমার ভোট আমি দেবো’- এই অধিকারটিই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নয়া দিগন্ত : অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন? এটি কি ব্যতিক্রমী?

শাহরিয়ার কবির : ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্বাচন ছিল ক্ষমতার দাপটের নির্বাচন। তখন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল না, ছিল ‘মার-মার কাট-কাট’। যে ক্ষমতায় থাকত, সে-ই জিতত। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধান এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, ক্ষমতায় গেলে শাসককে নামানোর কোনো কার্যকর সাংবিধানিক উপায় থাকে না। এই কাঠামোর ভেতর থেকেই একনায়কতন্ত্র জন্ম নেয়।

নয়া দিগন্ত : আমরা প্রায়ই শুনি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার নামে ‘দশটি হোন্ডা, পনেরজন গুন্ডা’- এটি কী বোঝায়?

শাহরিয়ার কবির : এর অর্থ ভোট বাক্স ছিনতাই। কিন্তু ভোট ডাকাতি আর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এক জিনিস নয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয় তখনই, যখন প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও অর্থনৈতিক শক্তি এক সাথে কাজ করে।

এরশাদের সময় কাজী জাফর আহমেদ বলেছিলেন রাজনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। তখনই মিলিটারি ও সিভিল আমলারা আপত্তি তুলেছিল। মিলিটারি আমলারা বলেছিল- আমরা থাকলে আপনি ক্ষমতায়, আমরা না থাকলে আপনি ক্ষমতায় নেই। সিভিল আমলারা বলেছিল- রিটার্নিং অফিসার আমি, গণনাকারী আমি, ফল ঘোষণা করব আমি, মনোনয়ন বৈধ-অবৈধ করব আমি- তাহলে রাজনৈতিক দলের দরকার কী?

নয়া দিগন্ত : তখন কি দুর্নীতির সুযোগ চাওয়া হয়েছিল?

শাহরিয়ার কবির : তারা সরাসরি দুর্নীতির কথা বলেনি। বলেছিল- আমাদের ‘স্বাচ্ছন্দ্যে চলার’ সুযোগ দিন। বেতন বাড়ানোর দরকার নেই, সেটা রাজনৈতিক ইস্যু হবে। আমরা কীভাবে চলি, সেটা আমরা জানি- আপনি দেখবেন না। ব্যবসায়ীরা বলেছিল- দাম বাড়বে না, কিন্তু আমরা কীভাবে আমদানি করি, সেটা সরকার দেখবে না।

এ কারণেই ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যাতেও দেশে দুর্ভিক্ষ হয়নি। আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং তখন থেকেই শুরু। এরশাদের সময় গার্মেন্টস ও ম্যানপাওয়ার ব্যবসার বিস্তার ঘটে। দুর্নীতি করতে গেলে বড় প্রকল্প লাগে। এই মডেলটিই শেখ হাসিনা আরো বড় স্কেলে কপি করেছেন- কুইক রেন্টাল থেকে শুরু করে সড়ক নির্মাণ পর্যন্ত।

নয়া দিগন্ত : তা হলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী?

শাহরিয়ার কবির : ২০০৮ সাল ছিল প্রশাসনকে ম্যানুপুলেট করে হওয়া একমাত্র নির্বাচন। এখানে ভোট আপনি দেবেন, কিন্তু ফলাফল নির্ধারণ করবে অন্য কেউ। সেই ‘অন্য কেউ’ রাজনৈতিক দল নয়- বিদেশী প্রভু বা একাধিক বিদেশী শক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক কাঠামো।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের জিওপলিটিক্স এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

শাহরিয়ার কবির : ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর থেকেই এই অঞ্চলে একটি পরিকল্পনা চলছে- বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ‘সিকিম’ বানানোর। রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় মনে করে ক্ষমতায় যেতে হলে জনগণ নয়, প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে হবে। মানুষ ভোট দেয় ম্যানিফেস্টো দেখে, আর ম্যানিফেস্টোতে জিওগ্রাফি, জিওপলিটিক্স, অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা- সব থাকতে হয়।

নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান, অথচ সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ তুলে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশী প্রভু।

নয়া দিগন্ত : জুলাইয়ের পর জাতীয় সরকার কেন গঠন করা হয়নি?

শাহরিয়ার কবির : এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিএনপি বলেছে, জামায়াত বলেছে- জাতীয় সরকার দরকার। তা হলে ৫ আগস্টের পরই কেন করা হলো না? জাতীয় সরকার ছাড়া রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার সম্ভব নয়। বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব হয়- এটা ইতিহাস।

নয়া দিগন্ত : দেড় বছরে সংস্কার নিয়ে কাজ তো হয়েছে?

শাহরিয়ার কবির : সময় নষ্ট হয়নি, কিন্তু ভুল কাঠামোর মধ্যে সংস্কার করতে গিয়ে সরকার দুর্বল হয়েছে। তথাকথিত নিরপেক্ষ সরকার আসলে স্বাধীন নয়। প্রতিটি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক দলের কাছে দৌড়াতে হয়। জাতীয় সরকার না করাটাই ছিল ঐতিহাসিক ভুল।

নয়া দিগন্ত : খেলাপি ঋণ ও নির্বাচন কি একে অপরের সাথে যুক্ত?

শাহরিয়ার কবির : নির্বাচন এখন মানি-মেকিং মেশিন। ঋণখেলাপিরা স্টে অর্ডার এনে মনোনয়ন বৈধ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২ শতাংশ পরিশোধের সার্কুলার ভেঙে ০.৫ শতাংশে ঋণ রিসিডিউল করা হচ্ছে। ভোটের পর সেই টাকা আর ফেরত আসে না- সবাই জানে।

নয়া দিগন্ত : তা হলে কি গণভোট ছাড়া কোনো পথ নেই?

শাহরিয়ার কবির : না। জুলাই সনদে জাতীয় সরকার প্রশ্নে গণভোটে ‘হ্যাঁ বা না’ দিলেই হতো। একই লোক দিয়ে নির্বাচন করে নতুন বন্দোবস্ত আশা করা আত্মপ্রবঞ্চনা।

নয়া দিগন্ত : জামায়াত-বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে আপনার উদ্বেগ কী?

শাহরিয়ার কবির : এই দুই দলের মধ্যে ফাটল হলে লাভ হবে সেই শক্তির, যারা জুলাই ব্যর্থ করতে চায়। ২০০১-২০০৬ সালের ভুল আমাদের মনে রাখতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া কখনো এ্যাবসুলিউট পাওয়ার চাননি। তিনি আদর্শগত মিল দেখেই জোট করেছেন।

নয়া দিগন্ত : দিনশেষে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?

শাহরিয়ার কবির : আমি আশাবাদী। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশকে সিকিম বানানো যায়নি। যারা বানাতে চায়, তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে।

দেশ গড়তে হলে নতুন বন্দোবস্ত লাগবে। মুখে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ বললেই হবে না- কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে। আর কোনো রক্ত নিয়ে যেন রাজনীতি না হয়- এটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

নয়া দিগন্ত : ইভিএমে ২২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু এখন বুথে ক্যামেরা নেই- এটি কীভাবে দেখেন?

শাহরিয়ার কবির : বুথে ক্যামেরা বসিয়ে বা ভোটারের শরীরে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে ভোট রক্ষা করা যায় না। ম্যাকিয়েভেলির ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী পাঁচ লাখ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের পার্থক্য দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। একটি নির্বাচনী এলাকায় যতগুলো ভোটকেন্দ্র থাকে, প্রত্যেকটিতে মাত্র দশটি করে জাল ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করলেই পুরো ফলাফল পাল্টে যায়। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই কিছু নিশ্চিত ভোটের এলাকা থাকে। এসব এলাকায় ম্যানুপুলেশন করা মোটেই অসম্ভব নয়। ধরা যাক, বিএনপির আসলাম সাহেব- তিনি চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি। আমি ঋণদাতা একটি ব্যাংকের পক্ষের আইনজীবী ছিলাম। তিনি হাইকোর্টে রিট করে স্টে অর্ডার নিলেন। প্রিজাইডিং অফিসার সেই স্টে অর্ডার দেখেই তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেন। গত পনেরো বছরে অনেকেই ‘সিভিল মাস্টার’ হয়ে গেছে। ডেপুটি কালেক্টর থেকে জেলা প্রশাসক হয়েছেন, কিন্তু কোনো দিন জনতার ক্ষমতায়ন চাননি। যাদের জনগণের চাকর হওয়ার কথা, তাদের প্রভু বানানো হয়েছে। তারা কি জনগণের কথা শুনবে?

আপিল বিভাগে কোনো ব্যাংক সিপি ফাইল করার পর রাতের মধ্যেই কী এমন ম্যাকানিজম ঘটে যে পরদিন সকালে সেই সিপি প্রত্যাহার হয়ে যায়? ব্যাংক যখন আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়, তখন আইনজীবীদের আর কিছু করার থাকে কি?

নয়া দিগন্ত : খেলাপি ঋণ আদায় হবে কিভাবে?

শাহরিয়ার কবির : আইনে বলা আছে- ব্যাংক ও প্রার্থী ছাড়া আর কেউ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। ব্যাংক যখন নিজেই পিছু হটে যায়, তখন আর কী করার থাকে? বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে স্পষ্ট বলা আছে- ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২ শতাংশ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বিএনপির এক প্রার্থীকে বলেছে, পয়েন্ট ফাইভ শতাংশ দিলেই চলবে।

২ শতাংশ ঋণ পরিশোধ করলে ব্যাংক পেত দুই কোটি টাকা। কিন্তু ২০ কোটি টাকা নিয়ে ওই প্রার্থীর ঋণ রিসিডিউল করে দেয়া হয়েছে। পরে যখন ওই প্রার্থীর নাম আর সিআইবিতে থাকে না, তখন নির্বাচন কমিশন কী করবে? কিন্তু আমরা সবাই জানি- এই ভোটের পর ওই ব্যক্তি আর টাকা দেবে না।

নয়া দিগন্ত : তা হলে কি নির্বাচন এখন একটি মানি-মেকিং মেশিনে পরিণত হয়েছে?

শাহরিয়ার কবির : ঠিক সেটাই। আমি জামায়াতে ইসলামকে সমর্থন করি এই কারণে যে, তারা এই সংসদকে একটি ‘ল মেকিং হাউজ’ বানাতে চায়- মানি-মেকিং নয়। তারা স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়িত করার কথা বলে।

এই মানি-মেকিং প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা টাকা বিনিয়োগ করে। ব্যবসায়ী কি নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু করবে? করবে না। সে বিনিয়োগ করলে কী চাইবে- ক্ষমতা, প্রভাব, সুবিধা। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল জাতীয় সরকার গঠন না করা। দ্বিতীয় ভুল হচ্ছে- একই দিনে দুটি ভোট আয়োজন করা, অথচ সেই পরিমাণ ম্যানপাওয়ার নেই।

আপনি বলছেন টাকা অনেক লাগবে- তাই করা যাচ্ছে না। তা হলে সবাই মিলে গণভোট করে জাতীয় সরকার গঠন করলেই তো হয়। গণভোটে একটি প্রশ্ন জুড়ে দিলেই হতো- জাতীয় সরকার চান কি না, হ্যাঁ বা না।

নয়া দিগন্ত : এর আগে তো বলা হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা হবে?

শাহরিয়ার কবির : সেটাও করা হয়নি টাকার অজুহাতে। অথচ জুলাই সনদে জাতীয় সরকার গঠনের প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করলেই হতো। চলমান সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগবে- রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু যাদের দিয়ে ভোট করাচ্ছেন, তারা তো গত পনেরো বছরে রিক্রুট হওয়া লোক। তা হলে আপনি কী করছেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল হঠাৎ করে বললেন- তিনি একটি আদর্শকে ‘মেরে ফেলতে চান না’। তিনি আমার প্রিয় মানুষ, জাসদ করতেন। কিন্তু মুজিববাদ একটি আদর্শ- এটা মানি, কিন্তু সেটা একটি নাৎসি আদর্শ। নাৎসি আদর্শ, আধিপত্যবাদ- যেটা সারা পৃথিবীকে গ্রাস করতে চায়- আপনি কি সেটাকে টিকিয়ে রাখতে চান? একনায়কতন্ত্রও তো একটি মতবাদ। তা হলে বাকশালকে জিইয়ে রাখতে চান কেন? তা হলে ফাঁসির দরকার নেই। ফ্রি সোসাইটি, গণতন্ত্র- সব আমি মেরে ফেলতে পারি। অমুকের মেয়েকে তুলে নিয়ে যেতে পারি। এটাই তো বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের বাস্তবতা ছিল।

নয়া দিগন্ত : তা হলে গণভোট ছাড়া কি কোনো পথ নেই?

শাহরিয়ার কবির : যখন এসব কথা বলি, তখন আমার চোখের সামনে তিনটি স্তর ভেসে ওঠে। প্রথম স্তর- ৩৬ জুলাই যারা প্রাণ দিয়েছেন, ভাই ও সন্তানদের রক্তের ধারাটা দেখি। দ্বিতীয় স্তর- একজন তরুণ নতুন বন্দোবস্ত চালু করতে চায়, তীব্র প্রতিবাদ করছে। তখন নতুন কিছু বললে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষারথাকখালদ বললে, আপনাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। এই স্তরটাই হচ্ছে ‘হাদি’।

তৃতীয় স্তর- বেগম খালেদা জিয়া। যার কাছে সন্তানের চেয়েও দেশ বড় ছিল। সে কারণেই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। দুই ছেলেকে বাঁচাতে চেয়েও একটি সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। তার পরও মাটি কামড়ে দেশে ছিলেন। শেষ সময়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে থেকে যাননি- ফিরে এসেছেন।

নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন, পুরো পরিবারটিই জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক?

শাহরিয়ার কবির : আমার কাছে তাই। ২০০৬-০৭ সালে ইয়াজউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনা হুট করে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া কোথাও যাননি। শেখ হাসিনা বন্দোবস্ত করে ফিরে এসেছিলেন- সেই বন্দোবস্ত ভারত করে দিয়েছিল। শেখ হাসিনা, আব্দুল জলিল- সবাই তখন ইংল্যান্ডে ছিলেন।

জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলো। শেখ হাসিনা ও সাজেদা চৌধুরী কেন আখাউড়া সীমান্তে ধরা পড়লেন- এর কারণ কী? এখন যখন নতুন বন্দোবস্তের কথা শুনি, তখন প্রশ্ন জাগে- এটা আসলে কী?

নয়া দিগন্ত : আপনি যেটাকে সংস্কার বলছেন, তার মূল দাবি কী?

শাহরিয়ার কবির : সংস্কারের মূল দাবি হলো- বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে শাসক একটি মনস্টারে পরিণত হয়। নিরপেক্ষ ভোটের কোনো সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কোনো দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়।

অনেকে একাত্তরের সাথে ২৪ ও ৩৬ তুলনা করছে। কিন্তু একাত্তরে আপনি পাকিস্তানি ছিলেন, জুলাইয়ে আপনি বাংলাদেশী। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি করেছে, আর ২৪-এ আপনার নিজের পুলিশ আপনাকে গুলি করেছে। একাত্তরে বৈষম্য ছিল সার্ভিস ডিসপ্যারিটির প্রশ্নে, আর ২৪-এ বৈষম্য সর্বক্ষেত্রে। হ্যাঁ, আপনি ভূখণ্ড ও পতাকা পেয়েছেন, কিন্তু আমি আমার সার্বভৌমত্ব পাইনি। পনেরো বছরে সেটাও বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব তো শঙ্কায় পরিণত হচ্ছে?

শাহরিয়ার কবির : জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব যদি এই দুটি দলকে আলাদা করে দেয়, জাতীয় সরকার যদি সত্যিকার অর্থে গঠন না করা হয়, তা হলে আমাদের গন্তব্য ব্যাহত হবে এবং প্রতিবিপ্লব হবে।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছি, কারণ দিল্লি চায় একটি দল ২৪০ থেকে ২৫০ আসন পাক। যেভাবেই হোক, সেটাই দেয়া হবে। ২৪০ আসন মানে এ্যাবসুলিউট পাওয়ার, আর এ্যাবসুলিউট পাওয়ার মানেই এ্যাবসুলিউট অ্যানার্কি।

নয়া দিগন্ত : ‘ব্রুটাল মেজরিটি’ বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?

শাহরিয়ার কবির : ব্রুটাল মেজরিটি হয়ে গেলে আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাইবেন না। ১৯৯১ সালে তিনদলীয় জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সংসদীয় গণতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই বাস্তবায়ন করা যায়নি। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। আজ যদি জুলাই সনদ না হয়, অন্য রাজনৈতিক দলগুলো কি মেনে নেবে?

নয়া দিগন্ত : আপনি বারবার ‘সাইক্লিক অর্ডার’-এর কথা বলছেন।

শাহরিয়ার কবির : এই সাইক্লিক অর্ডার বা পাতা ফাঁদে বারবার পা দিচ্ছেন কেন? আমার ভোট আমি দেবো। ভোটার যাকে ভোট দেবে, সেটাই মেনে নিতে হবে। আমি কেন দাবি তুলব- কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট হওয়া চলবে না? শাকসু নির্বাচনের সাথে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা কোথায়?

এর মানে ভেতরে আঁতাত ঢুকে গেছে। আপনার ভাগ্যের পরিবর্তন বিদেশী প্রভুরা করবে। তারা আপনাকে ২৪০ আসন দেবে, তার পর দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। বিএনপি কোনো দিন সেই ফল ভোগ করতে পারেনি। বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শিতা ছিল- তিনি কখনো এ্যাবসুলিউট পাওয়ার চাননি।

নয়া দিগন্ত : দিনশেষে আপনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?

শাহরিয়ার কবির : আমি আশাবাদী। আল্লাহ সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না। জুন মাসেও জানতাম না শেখ হাসিনা পড়ে যাবে। আমরা তো একটি বালির ট্রাকও সরাতে পারিনি। আল্লাহ আবাবিল পাখির মতো সাহায্য পাঠান।

তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশকে সিকিম বানানো যায়নি। যারা বানাতে চায়, তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর দূরদর্শিতা থাকতে হবে। আমাদের রক্ত নিয়ে যেন আর কেউ রাজনীতি না করে। দেশ গড়তে হলে নতুন বন্দোবস্ত লাগবে। মুখে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ বললেই হবে না- কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে।