মানুষকে অবজ্ঞা করা গুনাহ

Printed Edition

ডা: মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের আচার-আচরণে সৌজন্য, বিনয়, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মানকে অপরিহার্য করা হয়েছে। কাউকে অবজ্ঞা বা অসম্মান করা ইসলামে কেবল নৈতিক ত্রুটি নয়; বরং গুরুতর গুনাহ। কারণ, এটি মানুষের হৃদয়ে আঘাত হানে, সমাজে বিভেদ তৈরি করে এবং অহঙ্কার জন্ম দেয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এবং তাঁর রাসূল সা: অসংখ্য হাদিসে অন্যের মর্যাদা রক্ষা ও সদ্ব্যবহার করার উপর জোর দিয়েছেন। প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা এবং অন্যকে অপমান না করা ঈমানের অংশ।

অবজ্ঞা ও অসম্মানের অর্থ : অবজ্ঞা হলো অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা, ছোট করে দেখা বা তার গুণাবলি অস্বীকার করা। অসম্মান হলো কারো মর্যাদা, সুনাম বা ব্যক্তিত্ব ক্ষুণœ করার মতো আচরণ বা কথা বলা।

এর মূল কারণ অহঙ্কার, আত্মপ্রশংসা, হীন দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যকে ছোট ভাবা- যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।

কুরআনের আলোকে নির্দেশনা : আল্লাহ বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অপর সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম’ (সূরা হুজরাত-১১)। আরেক স্থানে আল্লাহ সতর্ক করেছেন- ‘তুমি মানুষকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখো না এবং অহঙ্কারভরে পৃথিবীতে হাঁটো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহঙ্কারী ও আত্মগর্বকারীকে পছন্দ করেন না’ (সূরা লুকমান-১৮)। আল্লাহ আরো বলেন- ‘তোমরা ভালো কথা বলো এবং শয়তান তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে উসকানি দিয়ে থাকে’ (সূরা আল-ইসরা-৫৩)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়- ১. ভালো ও সুন্দর কথা বলা ফরজ নয় কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদব- আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা সবসময় এমন কথা বলে যা উত্তম, ভদ্র এবং কল্যাণকর হয়। ২. অশোভন বা কটু কথা বিরোধ সৃষ্টি করে : শয়তান মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লাগানোর প্রধান উপায় হলো খারাপ কথা, অপমানজনক মন্তব্য বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করা। ৩. শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি : শয়তান প্রকাশ্য শত্রু হওয়ায় সে সবসময় চায় মানুষকে বিভক্ত করতে এবং সম্পর্ক নষ্ট করতে। ৪. ভাষা নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানের অংশ : ভালো কথা বলা শুধু সৌজন্য নয়; বরং এটি আল্লাহর হুকুম পালন এবং শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায়। এ ছাড়া কুরআনে গিবত, অপবাদ ও উপহাসকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (সূরা হুজরাত-১২)। যেখানে গিবতের তুলনা করা হয়েছে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সাথে, যা চরম ঘৃণিত। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়- ১. অকারণ সন্দেহ করা নিষিদ্ধ : অনেক সময় মানুষ ভিত্তিহীন ধারণা করে এবং তা গুনাহে পরিণত হয়। ২. গুপ্তচরবৃত্তি করা হারাম : কারো ব্যক্তিগত বিষয় অনুসন্ধান করে ত্রুটি বের করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ৩. গিবত (পেছনে নিন্দা করা) মারাত্মক গুনাহ : কুরআন গিবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। ৪. আল্লাহর ভীতি গড়ে তোলা জরুরি : এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হলে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি থাকতে হবে। ৫. তাওবার সুযোগ সবসময় খোলা : কেউ যদি এ গুনাহগুলো করে থাকে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন।

হাদিসের আলোকে শিক্ষা : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ১. ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (বুখারি-১০)। ২. ‘যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (মুসলিম-৯১)। ৩. ‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করবে, তার পক্ষে মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট (মুসলিম-২৫৬৪)। ৪. ‘যে মানুষকে সম্মান করে না এবং ছোটদের প্রতি দয়া করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (তিরমিজি-১৯২১)। ৫. ‘তোমরা একে অপরকে হিংসা করো না, পেছনে নিন্দা করো না এবং একজন আরেকজনকে তুচ্ছ করো না’ (মুসলিম-২৫৬০)।

অবজ্ঞা ও অসম্মানের ক্ষতি : মানবসম্পর্ক নষ্ট করে, পরিবার, বন্ধু ও সমাজে বিভেদ তৈরি হয়। অহঙ্কার বাড়ায়- যা আল্লাহর অপছন্দনীয় এবং গুনাহের কারণ। বিদ্বেষ জন্মায়, মানুষের অন্তরে ঘৃণা ও প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি করে। আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে, কারণ অহঙ্কারী ও অপমানকারী আল্লাহর প্রিয় হতে পারে না। সমাজের ঐক্য নষ্ট করে- শ্রেণী, জাতি ও পেশাগত বিভেদ বাড়ায়।

ইসলামের প্রস্তাবিত আচরণবিধি : ১. বিনয় অবলম্বন : আল্লাহ বলেন- ‘রহমানের বান্দারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলে’ (সূরা ফুরকান-৬৩)। ২. ভালো কথা বলা : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে (বুখারি-৬০১৮)। ৩. ক্ষমাশীল হওয়া : অন্যের ভুল ক্ষমা করা এবং সম্পর্ক অটুট রাখা। ৪. পেছনে নিন্দা না করা : কুরআনে গিবতের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ৫. অহঙ্কার ত্যাগ : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদা দান করেন’ (মুসলিম-২৫৮৮)।

ইসলাম এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে মানুষ একে অপরকে ভালোবাসবে, সম্মান করবে এবং কারো মর্যাদা ক্ষুণœ করবে না। অবজ্ঞা ও অসম্মান শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং সামাজিক বিভাজনের বড় কারণ। এ জন্য সূরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াত আমাদেরকে স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়, আমরা যেন ভিত্তিহীন সন্দেহ থেকে দূরে থাকি, কারো গোপন বিষয় অনুসন্ধান না করি এবং কারো অনুপস্থিতিতে নিন্দা না করি।

গিবত, সন্দেহ ও গুপ্তচরবৃত্তি শুধু সামাজিক অশান্তি নয়; বরং আল্লাহর কাছে বড় গুনাহ। তাই আমাদের উচিত আল্লাহভীতি অর্জন করে জিহ্বা ও অন্তরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের প্রতি সদ্ব্যবহার করা এবং যদি এসব গুনাহ হয়ে যায় তবে তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী, আমাদের উচিত অহঙ্কার ত্যাগ করা, পরস্পরকে মর্যাদা দেয়া, ভালো কথা বলা এবং সহনশীলতা অবলম্বন করা। প্রকৃত মর্যাদা তাকওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা এবং সদাচারণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক