আলজাজিরা
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক নৌসীমায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। ভেনিজুয়েলার একটি তেলবাহী জাহাজ আটক করার কয়েক দিনের মধ্যেই এই হামলা হয়েছে। এর ফলে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে সোমবার আন্তর্জাতিক নৌসীমায় থাকা তিনটি জাহাজে ‘মারাত্মক কাইনেটিক স্ট্রাইক’ চালানো হয়। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, ‘গোয়েন্দা তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, নৌযানগুলো প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের জ্ঞাত মাদক চোরাচালান রুট ধরে যাচ্ছিল আর সেগুলো মাদক পাচারে রত ছিল।’
পোস্টে বলা হয়েছে, প্রথম জাহাজে তিনজন, দ্বিতীয়টিতে দুইজন এবং তৃতীয়টিতে তিনজন নিহত হয়েছে। নিহতদের মাদক পাচারের সাথে যুক্ত বলে দাবি করা হলেও, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ভেনিজুয়েলার কাছে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ২০টিরও বেশি নৌযানে আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের অভিযোগ, ওই অঞ্চল থেকে চোরাচালান হয়ে আসা মাদকে অনেক মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনিজুয়েলার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন বাহিনীর চালানো এ ধরনের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনাকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে, সেপ্টেম্বরে একটি নৌকায় প্রথম হামলার পর বেঁচে যাওয়া দুই ব্যক্তির ওপর দ্বিতীয় দফা হামলার নির্দেশ তিনি ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তবে পেন্টাগন দাবি করেছে, মাদক পাচার রোধের অংশ হিসেবেই ক্যারিবীয় সাগর ও মেক্সিকো উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ, একটি সাবমেরিন, ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। ভেনিজুয়েলা এই হামলা ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভেনিজুয়েলার অগাধ তেল ও গ্যাস সম্পদ লুটে নেয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এ দিকে ভেনিজুয়েলার একেবারে কাছেই অবস্থিত ক্যারিবীয় দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিমানবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। সোমবার দেশটি জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বিমানগুলো ‘লজিস্টিক কার্যক্রম’, সরবরাহ পুনঃভরাট এবং সেনা সদস্যদের নিয়মিত রোটেশনের কাজে এসব বিমানবন্দর ব্যবহার করবে। ভেনিজুয়েলার মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিকে সমর্থন জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কামলা প্রসাদ-বিসেসার মন্তব্য করেন, তিনি মাদক পাচারকারীদের ‘টুকরো টুকরো হয়ে যেতে’ দেখতে বেশি পছন্দ করবেন, তার নাগরিকদের হত্যার শিকার হতে দেখার চেয়ে। এর জবাবে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আবারো ঘোষণা দেন, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল টেলেসুর।
সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালাতে সামরিক বাহিনীর ব্যবহার এই সমস্যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে যেভাবে কাজ করতো তার থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়া নির্দেশ করছে। এসব হামলাকে ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের স্থল হামলার আগাম সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে যা শিগগিরই শুরু করার কথা বলেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ক্যারিবীয় সাগর অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। ইতোমধ্যে সেখানে দেশটির বিমানবাহী রণতরী বহরসহ ১০ হাজারেরও বেশি সেনা, নিউক্লিয়ার শক্তি চালিত ডুবোজাহাজ, এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং তাদের অধীনে থাকা দ্বীপ পুয়ের্তো রিকোর সামরিক ঘাঁটিতে অনেকগুলো অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জড়ো করেছে ওয়াশিংটন।



