নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সমঝোতা আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগরেহিও দুই পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি আসার কথা জানিয়েছেন। খবর বিবিসির।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নিয়ে ‘কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই’ একটি বড় ইতিবাচক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গতকাল রোববার মার্কো রুবিও বলেন, আমার মনে হয় আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব একটা ভালো খবর পেতে যাচ্ছে।
রুবিওর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন একটি ৬০ দিনের বর্ধিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য এই সমঝোতায় ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন সরিয়ে নেবে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং বন্দরগুলোর অবরোধ তুলে নেবে, যাতে ইরান আবার অবাধে তেল রফতানি করতে পারে।
প্রস্তাবিত এই শান্তি চুক্তিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি থাকবে, যা পরবর্তীতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে আরো বাড়ানো যাবে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে কোনো শুল্ক ছাড়াই জাহাজ চলাচল করতে পারবে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার করবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধের সমাপ্তিও এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে ইরান এখনও এই খসড়া চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি। তেহরান শুধু ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ট্রাম্পের কাজের বিনিময়ে সুবিধা নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ ইরান যত দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ নেবে, তত দ্রুত তাদের সুবিধা দেয়া হবে।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপে এই চুক্তির কিছু শর্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে লেবাননের বিষয়টি নিয়ে তার আপত্তি রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমঝোতা সাময়িকভাবে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে পারলেও, এটি পারমাণবিক ইস্যুতে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি দাবি পূরণ করবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমিয়ে আনা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এই চুক্তিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ অবস্থা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সাথে সঙ্ঘাত।
শনিবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এর চূড়ান্ত বিবরণ ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে একটি চুক্তি মূলত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। ট্রাম্প আরো বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালী আবার চালু করা হবে।
তিনি এই উদ্যোগকে ‘শান্তি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান, আলোচনায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্দান ও বাহরাইন অংশ নিয়েছে। রয়টার্স সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামোটি ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে। এতে থাকবে- আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালী সঙ্কটের সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য একটি বিস্তৃত চুক্তির লক্ষ্যে ৩০ দিনের আলোচনা পর্ব, যা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চলছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু দাবির সাথে তারা একমত নয় এবং কিছু বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সব দিক থেকে যুদ্ধ বন্ধের একটি রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাসনিম আরো জানায়, ইরান এখনো তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত বিষয় সমাধানের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা এবং পারমাণবিক আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছে। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সর্বশেষ প্রস্তাবকে একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি’ বা সমঝোতা স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এটি প্রথমে সাধারণ নীতি নির্ধারণ করবে, এরপর ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেন, বর্তমানে অগ্রগতির ধারা সঙ্ঘাত কমার দিকে, তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি কোথায় গড়ায় তা বোঝা যাবে। তিনি আরো বলেন, তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধ বন্ধ করা, ভবিষ্যতে মার্কিন হামলা বন্ধ করা এবং লেবাননে সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানো।



