গাজায় নিহত বেড়ে ৭২,২৬৭

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • গাজায় ত্রাণশিবিরে ইসরাইলের হামলা
  • ভারী বৃষ্টিতে গাজার বাস্তুচ্যুতদের দুর্ভোগ চরমে
  • আংশিক চালু রাফাহ ক্রসিং
  • গাজা ইস্যুতে হামাসের ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’ চায় যুক্তরাষ্ট্র

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ২৬৭ জন নিহত এবং প্রায় এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজারো মানুষের লাশ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় আরো দুইজন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৯০ জন নিহত এবং প্রায় এক হাজার ৮৭৬ জন আহত হয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি হামলার ফলে গাজার অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং ১৫ লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ জনসংখ্যার গাজায় অধিকাংশ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্রুত মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি এখনো দেখা যাচ্ছে না।

গাজায় ত্রাণশিবিরে ইসরাইলের হামলা

গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি ত্রাণশিবিরে ইসরাইলি হামলায় একজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সিভিল ডিফেন্সের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, গত বুধবার এই হামলায় অস্থায়ী তাঁবুগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং চার দিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আল-আকসা মার্টিয়ার্স হাসপাতাল হতাহতদের তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উভয়পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করছে।গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে গাজার লাখো মানুষ এখনো অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছে। সীমিত গণমাধ্যম প্রবেশাধিকার ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো।

ভারী বৃষ্টিতে গাজার বাস্তুচ্যুতদের দুর্ভোগ চরমে

গাজা উপত্যকায় টানা ভারী বৃষ্টিতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে ইসরাইলি হামলায় ঘরবাড়ি হারানো লাখো মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে, যা বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, বুধবার থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে বন্দরসংলগ্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক তাঁবুতে পানি ঢুকে পড়েছে এবং কাঁচা রাস্তা কাদায় পরিণত হয়েছে। বাসিন্দারা বালতি ও পাত্র দিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সঙ্ঘাতে গাজার অবকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এতে করে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। প্রায় ১৫ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে তাঁবুতে বসবাস করছে। শীত ও বৃষ্টির কারণে তাদের কষ্ট বহুগুণে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই পরিস্থিতি একটি বড় মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা না বাড়ালে সঙ্কট আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

আংশিক চালু রাফাহ ক্রসিং

গাজা উপত্যকার রাফাহ ক্রসিং আংশিকভাবে আবার চালু করা হয়েছে, যার ফলে সীমিতসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার থেকে এই কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার বর্ডার অ্যান্ড ক্রসিং অথরিটি। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক বিবেচনায় প্রথম ধাপে ১৮ জন রোগী ও তাদের সাথে থাকা ৩৩ জন সহযাত্রীকে যাতায়াতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে এই সুযোগ শুধু জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। এর আগে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে ইসরাইলি বাহিনী রাফাহ ক্রসিং বন্ধ করে দেয়।

গাজা ইস্যুতে হামাসের ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’ চায় যুক্তরাষ্ট্র

গাজা উপত্যকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং কার্যত ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’ নিশ্চিত করতে চাচ্ছে ওয়াশিংটন। খবর আলজাজিরার।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কায়রো বৈঠকে একটি লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করে, যেখানে বলা হয়েছে- গাজায় পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে তখনই, যখন হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের সব অস্ত্র সমর্পণ করবে। এর বিনিময়ে ইসরাইলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকরা এই প্রস্তাবকে একতরফা ও চাপ প্রয়োগমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন। গাজার বিশ্লেষক ওয়েসাম আফিফা বলেন, এটি আলোচনার প্রস্তাব নয়, বরং একটি ‘হুমকির বার্তা’। তার মতে, এতে ফিলিস্তিনিদের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তা বা পুনর্গঠনের কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি দেয়া হয়নি। এদিকে হামাসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তারা এই প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ নিরস্ত্রীকরণ করলে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও সম্ভাব্য হামলার মুখে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন এবং এটি গাজার মানবিক সঙ্কট আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো ও কাজাখস্তান

যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা উপত্যকায় মোতায়েন হতে যাওয়া সামরিক বাহিনীতে কোন কোন দেশ সদস্য হিসেবে থাকছে, তা নিশ্চিত করেছে জাতিসঙ্ঘ। গত মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া এক বক্তব্যে গাজাবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ নিকোলাই মøাদেনভ জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সে (আইএসএফ) সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো ও আলবেনিয়া। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া ‘গাজা সঙ্ঘাত নিরসনের সমন্বিত পরিকল্পনা’ অনুযায়ী এই আন্তর্জাতিক বাহিনী গাজার নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং হামাসের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর দায়িত্ব বুঝে নেবে। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় গত অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরাইলি বাহিনীর বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ফলে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যেই গাজার পুনর্গঠন ও শাসনের তদারকির জন্য ট্রাম্পের নির্দেশে গঠিত কারিগরি পর্ষদ ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা ইতোমধ্যে হাজার হাজার বেসামরিক পুলিশ সদস্য বাছাইয়ের কাজ এগিয়ে নিয়েছে। মøাদেনভ বলেন, এই কমিটি কেবল অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করবে। মূল লক্ষ্য হলো একটি সংস্কারকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তৈরি করা, যারা গাজা ও পশ্চিমতীর শাসন করবে এবং শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে। ইসরাইলের হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা বলছে, এই প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনি ও ইন্দোনেশীয় স্বার্থের অনুকূলে হতে হবে। এ ছাড়া ইরান-ইসরাইল যুদ্ধকেও একটি জটিল ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছে দেশটি। অন্য দিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বাহিনীতে তুরস্কের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করেননি; বরং তুর্কি বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মøাদেনভ নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের সহায়তায় গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রকরণ ও পুনর্বাসনের একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। তিনি হামাসসহ সব ফিলিস্তিনি পক্ষকে এই রূপরেখা মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটিই ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।