গণসমর্থন হারিয়ে যেভাবে চলছে আওয়ামী লীগ

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

ব্যাপক গণসমর্থন হারালেও আওয়ামী লীগের নেতারা এখনো কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনাহীন। ১৯৭১-পরবর্তী ইতিহাসে আওয়ামী লীগ অন্যতম অনিশ্চিত এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলের শত শত নেতা ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখন নির্বাসন বা আত্মগোপনে। ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দলটির অনেক নেতার জন্য রাজনীতি এবং নির্বাসন জীবন এখন অবিচ্ছেদ্য। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত তার জীবনকে অবিরাম বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা এবং শূন্য থেকে সবকিছু নতুন করে গড়ার মধ্য দিয়ে গঠিত বলে বিশ্বাস করেন। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে তিনি বলেন, পুরো ব্যবস্থাটাই এখন এলোমেলো, শূন্য থেকে গুছিয়ে নিতে হবে। রাজনীতির নিষ্পত্তি হোক বা না হোক, অনেক কাজ রয়েছে। কাজের একটি বড় অংশ হলো যোগাযোগ। নির্বাসনে থাকায় কোনো কোনো কাজ করতে দুই দিন লেগে যাচ্ছে

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

ব্যাপক গণসমর্থন হারালেও আওয়ামী লীগের নেতারা এখনো কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনাহীন। ১৯৭১-পরবর্তী ইতিহাসে আওয়ামী লীগ অন্যতম অনিশ্চিত এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলের শত শত নেতা ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখন নির্বাসন বা আত্মগোপনে। ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দলটির অনেক নেতার জন্য রাজনীতি এবং নির্বাসন জীবন এখন অবিচ্ছেদ্য। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত তার জীবনকে অবিরাম বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা এবং শূন্য থেকে সবকিছু নতুন করে গড়ার মধ্য দিয়ে গঠিত বলে বিশ্বাস করেন। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-কে তিনি বলেন, পুরো ব্যবস্থাটাই এখন এলোমেলো, শূন্য থেকে গুছিয়ে নিতে হবে। রাজনীতির নিষ্পত্তি হোক বা না হোক, অনেক কাজ রয়েছে। কাজের একটি বড় অংশ হলো যোগাযোগ। নির্বাসনে থাকায় কোনো কোনো কাজ করতে দুই দিন লেগে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার এই ধরনের পরিস্থিতি মূলত অনুপস্থিত। তখন একটি সাধারণ শত্রু ছিল, সামরিক শাসন, এখন এমন কোনো সাধারণ শত্রু নেই, যা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করবে এবং আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবে। ১৯৭৫ সালের পর অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধিতা করলেও, হাসিনার ক্ষমতার শেষ বছরগুলোতে হওয়া প্রতিবাদে হত্যাকাণ্ড, দমন-পীড়ন এবং স্বৈরাচারী শাসনের স্মৃতির কারণে আজকের জনরোষ আরো অনেক গভীর।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর পতন সত্ত্বেও, দলটির নেতারা বলেন যে, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং অনলাইন সমন্বয় করে সংগঠনটি সক্রিয় রয়েছে। ছাত্র লীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’কে বলেন, দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ এখন দলীয় কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, আইনি সহায়তার সমন্বয় এবং গ্রেফতার, নির্বাসন বা আত্মগোপনের ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সাক্ষাৎকার দেয়া প্রায় প্রত্যেক শীর্ষ নেতাই আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পতনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো দেশীয় বিরোধী দল, ইসলামপন্থী শক্তি এবং বিদেশী স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি সমন্বিত ষড়যন্ত্র। আরাফাতও হাসিনার সরকারের পতনের জন্য সরাসরি দেশীয় ও বিদেশী উভয় চাপকে দায়ী করেছেন। এই ব্যাখ্যাটি এখন আওয়ামী লীগের অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আরাফাত বলেন, ‘আমি বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। কিন্তু তারা বিচার করছে না। তারা মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক কারবার করছে।’

একই সাথে, আওয়ামী লীগ নেতারা এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, সরকারের পতনের পর দলের ভেতরে হাসিনার কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। দলের একাংশ নেতৃত্ব পরিবর্তন চায় এমন গুজবকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ছড়ানো অপপ্রচার বলে বারবার নাকচ করে দিয়েছে। আওয়ামী নেতারা এখনো মনে করছেন, শেখ হাসিনা এই দলের জন্য ঐক্যের প্রতীক, সংগ্রামের প্রতীক, প্রতিরোধের প্রতীক। ছাত্রলীগ নেতা রাকিবুল হাসান রাকিব হাসিনার নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘এর বাইরে কোনো বিকল্প নেই। আমরা এ নিয়ে ভাবিও না।’

বেশ কয়েকজন নেতা আরো যুক্তি দেন যে, জনজীবন থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দলটির একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও আদর্শিক সমর্থন ভিত্তি এখনো রয়েছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’কে বলেন, গণগ্রেফতার, হত্যাকাণ্ড এবং তার ভাষায় ‘রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষক জনতাতন্ত্র’ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অটুট রয়েছে।

এমনকি বাংলাদেশে অবস্থানরত নেতারাও অবরোধ, অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার ভাষায় দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন। রাকিব, যার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে এবং সাধারণ চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান। দলটির অনেক নেতা মনে করছেন, কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে সময়ের সাথে সাথে সাংগঠনিক কাঠামো যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৯৭৫ সালে মুজিব ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ যে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল, এটি তার আংশিক কারণ। তবুও বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকের আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগি ও রাজনৈতিক পরিবেশের মুখোমুখি।

১৯৭৫ সালের পর, সামরিক শাসন একটি সাধারণ রাজনৈতিক শত্রু তৈরি করেছিল, যা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগপন্থী শক্তিগুলোকে একটি বৃহত্তর স্বৈরাচার-বিরোধী মঞ্চের অধীনে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর সহানুভূতিও তৈরি হয়েছিল।

তা সত্ত্বেও, খুব কম বিশ্লেষকই মনে করেন যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে একেবারে উধাও হয়ে যাবে। বরং, বড় প্রশ্নটি হতে পারে যে দলটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে এবং আদর্শগতভাবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে কি না, অথবা এই ক্রমাগত বর্জন বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরো বেশি মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেবে কি না।

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনকে নতুন রূপ দিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে, দলটিকে অন্তত প্রতীকীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদারপন্থী বা মধ্য-বামপন্থী ধারার প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হতো। আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে দলটি কার্যকরভাবে অপসারিত হওয়ায়, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে আরো ডান দিকে সরে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে, যখন কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তখন তা প্রায়ই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আদর্শগত পুনর্গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে, রাজনীতি সাধারণত আরো বেশি মেরুকৃত হয়ে পড়ে, কারণ ব্যবস্থার ভেতরের ‘প্রতিরোধক’ শক্তিটি অদৃশ্য হয়ে যায়।’

আপাতত, আওয়ামী লীগ দু’টি বাস্তবতার মধ্যে আটকা পড়ে আছে: বহু বাংলাদেশীর চোখে দলটি গভীরভাবে কলঙ্কিত হয়েছে, অথচ ঐতিহাসিকভাবে ও সামাজিকভাবে এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে দেশের রাজনীতি থেকে একে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ যুক্তি দিয়েছেন যে, গত দেড় দশকে দলটির নিজস্ব গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়েই তা বোঝা সম্ভব। হাসিনার পতনের পর, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার ঝুঁকি নিতে কেউই রাজি নয়,’ এমনকি সেইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও, যারা এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা মুজিবের উত্তরাধিকার নিয়ে সতর্কতার সাথে কথা বলেন। ১৯৭৫ সালের পরের সময়ের মতো নয়, বর্তমান শাসকরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে ছাড় দিতে অনেক কম আগ্রহ দেখিয়েছে, যা দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে ফেরার পথকে আরো বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। জামায়াতে ইসলামীর ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞাসহ দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে যে তারা একটি মতবাদ অনুসরণ করে, তবে তাকে নির্মূল করা কঠিন।’

ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ভারতের অব্যাহত গুরুত্বের দিকেও আহমদ ইঙ্গিত করেন। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ের সাথে তুলনা টেনে তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী আবারো ভারতে আশ্রয় চেয়েছিলেন, ঠিক যেমন মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর বেশ কয়েকজন বাকশালপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব করেছিলেন।

তিনি যুক্তি দেন যে, আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের পরেও টিকে আছে। তার মতে, দলটির শেষ পর্যন্ত মুক্ত রাজনীতিতে ফিরে আসার ক্ষমতা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ওপরই নয়, বরং আন্তর্জাতিক চাপের ওপরও নির্ভর করতে পারে এবং বিশেষ করে ভারত ও তার মিত্র দেশের গৃহীত অবস্থানের ওপর।

একসময়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ, যা একসময় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান স্তম্ভ ছিল, জনজীবন থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু এর নেতারা এখনো অটল। গুলিস্তানে বা ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও একই রকম নীরবতা বিরাজ করছে। চত্বরের কিছু অংশ জুড়ে এখন অবাধে ঘাস জন্মেছে। শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের চরম সময়ে এটি যে একসময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল, তার কোনো চিহ্নই এখন আর অবশিষ্ট নেই। ধানমন্ডি ৩২, শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনে, পুরনো কাঠামোর কেবল খণ্ডাংশই অবশিষ্ট রয়েছে। যে বাড়িটি একসময় কড়া পাহারায় থাকত এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে প্রায় পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য হতো, এখন সেটি পরিত্যক্ত ও বিধ্বস্ত। এসব অফিসের দেয়াল জুড়ে স্লোগান। একটিতে লেখা, ‘ভারত-বাদ গুঁড়িয়ে দাও’। আরেকটিতে লেখা, ‘এই ভবন দেখে শিক্ষা নিন”, যা অনেকের মতে স্বৈরাচারী শাসনের পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে।

প্রায় দুই বছর ধরে দেশজুড়ে অনেক আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের এই অবস্থাই বিরাজ করছে। কোনো বড় সমাবেশ, দৃশ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাস্তায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। যদিও দলটি বেশ কয়েকবার হরতালের ঘোষণা দিয়েছিল, সেগুলোর দৃশ্যমান প্রভাব ছিল সামান্যই। কয়েক মাসে একবার কয়েকটি সংক্ষিপ্ত আকস্মিক মিছিল ছাড়া, দলটি রাজনৈতিক জীবন থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।

১৯৭৫ ও ২০২৪ সালে দলটির পরিণতি রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং দলের টিকে থাকার বিবর্তনে বড় ধরনের পার্থক্যও তুলে ধরে। ১৯৭৯ সালের সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ব্যাপক বিজয়লাভ করলেও, আবদুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের অংশটি ৪০টি সংসদীয় আসন জিতে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ সালের চিত্রটি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।

১৯৭৫ সাল এবং আজকের মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য মিল হলো ভারতকে ঘিরে পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহ। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর ভারতবিরোধী মনোভাব ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল এবং সেনাবাহিনীর সেই অংশের মধ্যে, যারা মুজিব সরকারকে নয়াদিল্লি ও মস্কোর সাথে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ বলে মনে করত। বর্তমান বাংলাদেশে, হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতবিরোধী বক্তব্য আবারো দৃশ্যমান হয়েছে, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে, যারা আওয়ামী লীগের সাথে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সমালোচক।

মুজিবের সরকারের পতন হয়েছিল একটি সহিংস সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যা সাথে সাথে রাষ্ট্রের কাঠামোকে বদলে দিয়েছিল। ২০২৪ সালের পতনটি ঘটেছিল কয়েক সপ্তাহের গণ-অসন্তোষ, যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এবং স্বৈরাচারী শাসন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষোভের মধ্য দিয়ে। রাস্তায় ট্যাংকের পরিবর্তে, সামাজিকমাধ্যম ও ডিজিটাল সক্রিয়তার মাধ্যমে প্রচারিত গণবিক্ষোভই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছিল।

স্মৃতির ভূমিকাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ১৯৭৫ সালে, রাজনৈতিক আখ্যানগুলো মূলত সংবাদপত্র, রেডিও এবং অভিজাত রাজনৈতিক মহলের মাধ্যমে তৈরি হতো। বর্তমানে দমনপীড়ন, বিক্ষোভে মৃত্যু এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ভিডিওগুলো অভ্যুত্থান শেষ হওয়ার অনেক পরেও অনলাইনে প্রচারিত হচ্ছে, যা আগের দশকগুলোর তুলনায় রাজনৈতিক পুনর্বাসনকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে।

মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর দলটি দুর্বল ও খণ্ডিত হয়ে পড়ে এবং অনেক নেতা আত্মগোপন করেন বা ভারতে পালিয়ে যান, কিন্তু দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সময়ের সাথে সাথে এটি পুনর্গঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসে। এর বিপরীতে, আজ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত, নির্বাচনী প্রতীক হারানো এবং রাজনৈতিকভাবে কাজ করার অধিকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জন-অনিচ্ছার সম্মুখীন হচ্ছে। (সংক্ষেপিত)