একসময় তারা ছিলেন রাজপথের পরিচিত মুখ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রধান কণ্ঠস্বর। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে জাতীয় রাজনীতির মূল কেন্দ্রে উঠে আসা এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। মূলত ২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে আগস্টে পতন ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের। এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। চব্বিশের এই জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটেছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের। পাশাপাশি এটি দেশের তরুণদের, বিশেষ করে ‘জেন জি’-এর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন সম্ভাবনারও জন্ম দিয়েছিল। এই অভ্যুত্থানের একেবারে অগ্রভাগে ছিলেন দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা। সেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই অভ্যুত্থানের একেবারে অগ্রভাগে ছিলেন দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা। সেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে দেশের প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে যাত্রা শুরু হয় দলটির। শুরুতে শাপলা প্রতীকের জোরালো দাবি থাকলেও শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ পায় ‘শাপলার কলি’। দলটির গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা দ্বিদলীয় ভিত্তি ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত’প্রতিষ্ঠা। চলতি বছরে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আটটি আসন (সংরক্ষিত নারী আসনসহ) নিয়ে সংসদে বর্তমানে বিরোধীদলীয় জোটে অবস্থান করছে দলটি। তবে রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে আসার পর দলটি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার বহনে এনসিপি কতটা সফল? দলটি কি চব্বিশের চেতনার ধারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রচলিত রাজনীতিরই অংশ হয়ে গেছে, এমন অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন আন্দোলনের অগ্রসেনানীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজপথের বিপুল জনপ্রিয়তাকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ভোটের রাজনীতিতে কাজে লাগানো যায়। আন্দোলনের সময় তাদের ডাকে লাখ লাখ ছাত্রজনতা রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন আর কাঠামোগত নির্বাচনী রাজনীতি যে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। তাদের মত, অভ্যুত্থানের আবেগকে শক্তিশালী সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে না পারলে রাজনীতির কঠিন মাঠে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
আন্দোলনের পরপরই ছাত্রনেতাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কয়েক মাস পর্যালোচনার পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ বা এনসিপি। দলটির নেতৃত্বে আসেন আন্দোলনের পরিচিত মুখ নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, আলী আহসান জুনায়েদ, রাফে সালমান রিফাতের মতো নেতারা। দলটি গঠনের সময় তারা ঘোষণা দেন, তাদের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়। বরং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
তবে দল গঠনের পর থেকেই এই তরুণ নেতাদের নানা চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে আন্দোলনের নির্দলীয় রূপ নষ্ট হওয়া নিয়ে। চব্বিশের আন্দোলনে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। তখন সবার লক্ষ্য অভিন্ন ছিল। কিন্তু দল গঠনের পর অনেকেই ভাবছেন, শিক্ষার্থীদের সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্ল্যাটফর্মটি এখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর চলে গেছে। জোটের রাজনীতি, নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ এবং রাজনৈতিক আপসের কারণে অনেকে অভিযোগ করছেন, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল আবেগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে তরুণ নেতাদের যুক্তি হলো রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে দাবি নিয়ে তারা আন্দোলন করেছেন, রাজনীতিতে না এলে এবং নীতিনির্ধারণী জায়গায় না পৌঁছালে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় আক্ষেপ তৈরি হয়েছে শহীদ পরিবার ও আহতদের প্রত্যাশা ঘিরে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন বা চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের পরিবারের মূল প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। তারা চেয়েছিলেন, দল গঠন বা নির্বাচনী রাজনীতির চেয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আহতদের পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ জোর দেয়া হোক। নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য এবং এনসিপির সিনিয়র নেতা আবদুল হান্নান মাসউদের মতো নেতারা সংসদে এ বিষয়গুলো নিয়ে সরব আছেন। তবে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মী ও সাধারণ মানুষের ধারণা, সংসদীয় রাজনীতির জটিল হিসাব, জোট রক্ষা এবং ক্ষমতার খেলায় মূল দাবিগুলো ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
আন্দোলনের সময় যাদের মুখ দেশজুড়ে পরিচিতি পায়, তাদের অনেকেই এখন সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত। কেউ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থেকে নীতিনির্ধারণ করছেন, কেউ সংগঠন গোছানোর কাজে ব্যস্ত। আবার কেউ মাঠপর্যায়ে নতুন কর্মী বানাচ্ছেন। পাশাপাশি, জুলাই আন্দোলনে নারীদের যে অসামান্য ভূমিকা ছিল, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও থাকা উচিত বলে মনে করেন নারী নেত্রীরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বড় দলের বলয়ে বন্দী। পেশিশক্তি, কালো টাকা আর পারিবারিক আধিপত্যের এই সংস্কৃতিতে নতুন কোনো দলের জায়গা পাওয়া সহজ নয়। একটি দলকে দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করে টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়মিত অর্থায়ন, তৃণমূল পর্যায়ে ত্যাগী নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। নতুন দল গঠন করা যতটা কঠিন, টিকিয়ে রাখা তার চেয়েও বেশি কঠিন। এসব ক্ষেত্রে নতুন এই তরুণ নেতৃত্বকে এখনো অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে। এসব সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের পরও এনসিপি তাদের রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে বেশ স্পষ্ট। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতায় তারা লক্ষ্য নতুন করে সাজিয়েছে।
মূলত ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তারা দেখছে, তা বাস্তবায়নে কয়েকটি ধাপে তারা এগোতে চায় :
১. স্থানীয় সরকারে তরুণ নেতৃত্ব :
সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর এনসিপি বুঝতে পেরেছে, তৃণমূলের ভিত্তি ছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলা কঠিন। তাই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে (ইউনিয়ন, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন) অংশ নিতে তারা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংগঠন গোছানো শুরু করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন ও তরুণ নেতৃত্ব তুলে আনা।
২. নাগরিক প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করা :
সংসদে মাত্র আটটি আসন নিয়ে তারা নতুন ধারার বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করলেও, নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে তারা সুশীল সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন ও অন্যান্য নাগরিক উদ্যোগের সাথে মিলে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, আট আসনের সীমাবদ্ধতা রাজপথ ও নাগরিক সমাজের চাপ দিয়ে পুষিয়ে নেয়া।
৩. জুলাই সনদ বাস্তবায়ন :
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে এনসিপি এখনো অনড়। তারা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য জনমতের চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো সংস্কারসহ নানামূখী সংস্কার বাস্তবায়নে তারা সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে চায়। দলের ভেতরের নানা আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার স্পষ্টভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে বলেন, ‘অনেকে আমাদের মধ্যে কোন্দল দেখতে চায়। কিন্তু এনসিপিতে বহুমত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। আমরা একনায়কতান্ত্রিক দল নই। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আমরা অবিচল।
সার্বিক বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের অবস্থানের কারণে রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত। গণভোটে যারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন, বিশেষ করে তরুণরা মনে করছেন তাদের রায় বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও তিনি আশা করেন, সংসদের মাধ্যমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সমাধান বের হবে। বারবার মানুষকে জীবন দিতে বা রাজপথে নামতে বলা দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়। তবে সংসদে সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য না হলে জনগণকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, ডানপন্থী জোটে যোগ দেয়ায় এনসিপির আদর্শ বদলায়নি। দল এখনো মধ্যপন্থী অবস্থানেই রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান, আপাতত এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব থেকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তর দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- আন্দোলনের জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দেয়া।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, নির্বাচনী জোটে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপিকে সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্নও তৈরি করেছে। একই সাথে তৃণমূলে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়া, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামাল দেয়া এবং আন্দোলনের আদর্শকে বাস্তব রাজনৈতিক কৌশলের সাথে মেলানোই হবে আগামী দিনে দলটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সফল গণআন্দোলনের শক্তিকে সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলে রূপ দেয়া এবং বিশ্বের অন্যতম প্রথম ‘জেন জি’ নেতৃত্বাধীন দল হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সংসদে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টি এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে।



