কুমিল্লায় পথসভা, ফেনীতে সুধী সমাবেশ

আমরা যেন- তেন নির্বাচন চাই না : ডা: শফিক

Printed Edition
দাউদকান্দিতে পথসভায় বক্তব্য রাখছেন ডা: শফিকুর রহমান: নয়া দিগন্ত
দাউদকান্দিতে পথসভায় বক্তব্য রাখছেন ডা: শফিকুর রহমান: নয়া দিগন্ত

কুমিল্লা প্রতিনিধি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা যেনতেন কোনো নির্বাচন চাই না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশায় এ দেশের মানুষ মুখিয়ে আছে। আমরা ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ মার্কা কোনো নির্বাচন দেখতে চাই না। বর্তমানে আমরা কিছু আলামত দেখতে পারছি। যারা এ ধরনের অপকর্মের জন্য চিন্তা করছেন তাদের জন্য স্পষ্ট বার্তা, মানুষ রক্ত দিয়ে পরিবর্তন এনেছে। আবার প্রয়োজনে রক্তের বিনিময়ে পরিবর্তনকে শতভাগ সফল করব ইনশা আল্লাহ। এখানে কাউকে ছাড় দেবে না এ জাতি। আমরাও দিতে চাই না। এ দেশের ছাত্র, যুবক ও শ্রমিক অতীতে যেমন নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে অধিকার কায়েমের জন্য লড়াই করেছে তারা আবারো শতভাগ সফলতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে। গতকাল সকালে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আলেখারচর বিশ্বরোড ও পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডে অনুষ্ঠিত পৃথক দু’টি পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি ফেনী জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে দু’টি পথসভায় বক্তব্য রাখেন। জামায়াতের আমির বলেন, যতদিন ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন আমাদের লড়াই চলবে। আমাদের লড়াই ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। এই ফ্যাসিবাদ পুরাতন হোক আর নতুন হোক।

রক্তের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে সেই রক্তের সাথে কাউকে বেঈমানি করতে দেবো না। তাদের রক্তের মূল্য আমরা পরিশোধ করতে চাই। আমরা চাই এই ধরনের আত্মত্যাগ যেন জাতিকে বারবার দিতে না হয়। কাজেই আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ওপর সেটা নির্ভর করবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইদানীং রাজনীতির নামে অপকর্ম আর লুটপাট আমরা লক্ষ্য করছি, আমরা সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে বলব সাবধান হোন। নিজেদের সামলান। না হলে জনগণই আপনাদের সামলে দেবে।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, কিশোর তরুণ যুবকদের জন্য এমন একটি দেশ রেখে যেতে চাই যেনো শান্তিতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারে। চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে আল্লাহর আইনের বিকল্প নেই। আমরা আল্লাহর আইনের প্রতি সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরী আমির কুমিল্লা-৬ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদের সভাপতিত্বে কুমিল্লা মহানগরীর সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের পরিচালনায় পথসভায় বক্তব্য রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ আমির অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাজাহান, উত্তর জেলা আমির অধ্যাপক আব্দুল মতিন, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দিন, অধ্যাপক এ কে এম এমদাদুল হক মামুন, কুমিল্লা-৮ বরুড়া আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক শফিকুল আলম হেলাল, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মু. মাহফুজুর রহমান, মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মু. কামারুজ্জামান সোহেল, কাউন্সিলর মোশাররফ হোসাইন, নাছির আহম্মেদ মোল্লা প্রমুখ। পথসভায় কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

যুবকদের সাথে নিয়ে কাজ করতে হবে

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন যুবকরা আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি, যুবকদের সাথে নিয়ে দেশকে স্বনির্ভর করতে হবে। তিনি গতকাল ফেনী যাওয়ার পথে সকাল সাড়ে ৬টায় দাউদকান্দি বিশ্বরোডে এক পথসভায় বক্তৃতাকালে উপরোক্ত কথা বলেন। ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, ইতিহাস বলে যুবকদের ছাড়া দেশ ও জাতির পরিবর্তন আসেনি। সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে যুবকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। পথসভায় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আমির অধ্যাপক আবদুল মতিন, জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আলমগীর সরকার, জেলা শ্রমিক কল্যাণ সেক্রেটারি, মাওলানা মোশাররফ হোসেন, উপজেলা নায়েবে আমির শরীফ মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন, দাউদকান্দি পৌর আমির আবুল কাশেম প্রধানীয়া প্রমূখ।

ফেনীতে সুধী সমাবেশে জামায়াত আমির

ফেনী অফিস জানায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ফ্যাসিজম সৃষ্টি হবে না। কালো টাকা ও পেশিশক্তির রাস্তা বন্ধ হবে। দেশে কোনো ফ্যাসিবাদ থাকতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা লড়াই করে যাবো। নির্বাচনের জন্য কিছু জরুরি ও মৌলিক সংস্কার করতে হবে। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করে নির্বাচন হলে সেটি হবে নির্বাচনের জন্য গণহত্যা। এটি আমাদের সন্তানদের রক্তের সাথে বেইমানি হবে। আমরা বেইমানি করব না। কাউকে বেইমানি করতে দেবো না। মৌলিক ও জরুরি সংস্কার বাধা দেয়া যাবে না। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে আবার ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হবে।’

গতকাল শনিবার বিকালে ফেনীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সুধী সমাবেশে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার, হেফাজতে ইসলামের সেক্রেটারি মাওলানা ওমর ফারুক, এনসিপির সংগঠক জাহিদুল ইসলাম সৈকত, আজিজুর রহমান রিজভী ও শাহওয়ালি উল্যাহ মানিক, জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি এটিএম সামছুল আলম চৌধুরী, আলেম-ওলামা, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিগণ অংশ নেন।

জেলা সেক্রেটারি মুহাম্মদ আবদুর রহীমের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবু তাহের মোহাম্মদ মাছুম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরের উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা: মোহাম্মদ ফখরুদ্দীন মানিক, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁঁইয়া ও অ্যাডভোকেট এসএম কামাল উদ্দিন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার আমাদেরকে উন্নয়নের মহাসড়কের কথা বলেছে। কিন্তু আমরা ওই উন্নয়নের মহাসড়ক দেখিনি। আমরা ২৬ লাখ কোটি টাকা পাচারের উন্নয়ন তাদের দেখেছি। রূপপুরে ৭২ হাজার টাকার বালিশ দেখেছি। বিরোধী দল ও মতের ওপর দানবীয় নির্যাতন ও বেপরোয়া তাণ্ডব জামায়াতের ১ থেকে ১১ নম্বর নেতা পর্যন্ত সিরিয়ালে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। রিমোট কন্ট্রোল রায় দিয়ে তারা শুধু আমাদেরকে খুন করেনি, তারা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে খুন করে দিয়েছে। জাহেলি যুগ থেকে এ পর্যন্ত সব সময় যুবকদের হাতেই সমাজ পরিবর্তন হয়েছে। যুবকরাই পরিবর্তনের নিয়ামক। জাতি হিসেবে আমরা আবু সাঈদদের কাছে ঋণী, তাদের বন্ধুদের কাছে ঋণী। তারা জীবন দিয়ে ৫ আগস্টের পরে আমাদের জাতিকে মুক্ত করেছে।’

তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দেশে যখন কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পুলিশ সদস্য ছিল না। তখন আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেছি। দীর্ঘ ১৫ দিন দায়িত্ব পালনের পর আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঘরে ফিরেছি। যখন থানাগুলোতে কাজের কোনো পরিবেশ ছিল না, তখন আমরা ২৩২টি থানায় যাবতীয় সরঞ্জাম দিয়ে কাজ শুরু করে পুলিশের সাথে ছিলাম। তাই আপনারা কোনো রাজনৈতিক দলের পুলিশ হবেন না। আপনারা নাগরিকদের পুলিশ হন।’

এর আগে দুপুরে একই ভেন্যুতে রুকন সম্মেলনে ডা: শফিকুর প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী সরকার স্বস্তির সাথে জামাতে নামাজও আদায় করতে দেয়নি। মহান আল্লাহ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এখন সুযোগ দিয়ে পরীক্ষা করছেন। এখনো চলার পথ মসৃণ নয়। দ্বীন কায়েমের সম্ভাবনা যত বেশি ষড়যন্ত্র তত গভীর হবে। সামনের সময় খুব কঠিন। ইসলামী দলগুলোকে টুকরো করে ভাগ ভাগ করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে ইসলামপন্থীদের মাথায় কাঠাল ভেঙে খেয়েছে। দ্বীন কায়েমের জন্য অন্যের সাথি নয়, নিজেরা নিজেদের সাথি হতে হবে। এটা দেখে অনেকের সাকরাতুল মাওত শুরু হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনগণকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমাদের ভয়কে জয় করতে হবে। মানবিক সমাজ তথা মানুষের অধিকার আদায়ে মানুষের কাছে যেতে হবে। যুবকরা যা চিন্তা করে আমরা সেটা পরিকল্পনা করি। ভুল হলে তালিকা নয়, দরদ দিয়ে সংশোধন করতে হবে। ভালো কাজের তালিকা করে এগিয়ে নিতে হবে। যুবসমাজকে ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি করতে হবে। বৈষম্যহীন, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়-ইনসাফ, শান্তির সমাজ বিনির্মাণে যুবকদের কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের চিন্তার সাথে অন্যদের সংঘাত চলছে। এ জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে জামায়াতের। আমরা নির্বাচনী মোর্চা নয়, দ্বীন-ইমানদারির প্রশ্নে ঐক্য হওয়া যাবে। আমরা কারো করুণার কাঙাল নই।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে কালো টাকা, পেশীশক্তির রাস্তা বন্ধ হবে। ফ্যাসিজম সৃষ্টি হবে না। পিআর পদ্ধতি হলে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন হবে এমন চিন্তা একটি বিশেষ দল থেকে প্রচার করা হবে। শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। ১৮ কোটি মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ হচ্ছে। এজন্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচন চাই। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে খারাপ লোকেরা নেতৃত্ব পেয়ে যায়। কথা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এ আওয়াজ জোরদার করতে হবে। দলের স্বার্থের ঊর্ধেŸ ওঠে দেশের স্বার্থ বড় প্রমাণ করতে হবে।’