আয়াজ আহমদ বাঙালি
নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বহুমাত্রিক আলোচনা চলছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা যেখানে নারীকে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সমান অধিকারের’ নামে এক ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে, ইসলাম সেখানে নারীকে সম্মান, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার এক পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেছে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য।
পশ্চিমা চিন্তাধারা নারী স্বাধীনতার নামে নারীর পণ্যায়ন করেছে। বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতে নারীকে পণ্যের মতো উপস্থাপন করা হয়- যেখানে তার শরীর, সাজসজ্জা ও যৌন আবেদনই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নারীর প্রকৃত সম্মান গৌণ হয়ে যায়, তার চরিত্র নয়; বরং বাহ্যিকতা হয়ে ওঠে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি। এই সমাজে নারী যত বেশি নিজেকে উন্মুক্ত করে, তত বেশি ‘স্বাধীন’ বলে বিবেচিত হয়।
অন্য দিকে ইসলাম নারীকে আত্মিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে এক পূর্ণ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। কুরআন বলেছে- ‘পুরুষ যা উপার্জন করে তার জন্য তারা দায়ী এবং নারীর যা উপার্জন, তার জন্য তারা দায়ী।’ (সূরা নিসা-৩২) নারী পুরুষের পরিপূরক- প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ইসলাম নারীর শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, বিয়ে ও তালাকসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট অধিকার নির্ধারণ করেছে।
ইসলামে নারী শুধুমাত্র মা, বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যা হিসেবে নয়, একজন ব্যক্তি হিসেবেও সম্মানিত। রাসূলুল্লাহ সা: নারীর প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করে।’ (তিরমিজি)
আজকের তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজে নারীর পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, চরিত্র ও নিরাপত্তা নিয়ে ততটা হয় না। অথচ ইসলাম নারীর পোশাকে লজ্জা, মর্যাদা ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। ইসলাম নারীকে গৃহবন্দী করেনি; বরং তাকে নির্দিষ্ট নৈতিককাঠামোর মধ্যে স্বাধীনতা দিয়েছে যেখানে সে নিজেকে রক্ষা করেও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসলাম নারীর জ্ঞানার্জনকে ফরজ করে দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য ফরজ। (ইবনে মাজাহ) নবী করিম সা: নিজে তার স্ত্রী আয়েশা রা: থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাকে শিক্ষাদান করেছেন এবং সাহাবিরা তার কাছ থেকে দ্বীনী পরামর্শ নিতেন।
পাশ্চাত্য সমাজ নারীর গঠনগত বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করে তাকে পুরুষের মতো বানাতে চায়, যেখানে নারীত্বের স্বাভাবিকতা, মাতৃত্ব, কোমলতা ও সংবেদনশীলতা হারিয়ে যায়। অথচ ইসলাম নারীত্বের নিজস্ব স্বকীয়তা ও সৌন্দর্যকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করে। পশ্চিমা সভ্যতা নারীকে ‘বাজারের মাল’ বানিয়েছে, আর ইসলাম নারীকে ‘নিরাপদ রতœ’ বানিয়েছে। ইসলামের নারীনীতি দাসত্ব নয়, দায়িত্ববোধ; পরাধীনতা নয়, মর্যাদাবোধ; বাহ্যিক চমক নয়, অন্তরস্থ সম্মানের প্রতি আহ্বান। আজকের বিশ্ব যদি সত্যিকার নারীমুক্তি চায়, তাহলে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।
লেখক : প্রবন্ধকার



