আবিদ আজাদ

নিয়ন আলোয় ফেরা শেকড়সন্ধানী ছায়া : গাউসুর রহমান

Printed Edition
আবিদ আজাদ
আবিদ আজাদ

আবিদ আজাদ সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যিনি শব্দের জাদুতে আধুনিক মানুষের সবচেয়ে অন্ধকার, সবচেয়ে বিপন্ন একটি রূপকে অমর করে রেখে গেছেন। তার কবিতায় অস্তিত্ববাদের যে হাহাকার, যে ইকো-ফেমিনিজমের স্নিগ্ধ ছায়া আর মার্ক্সবাদের যে প্রতিবাদী আগুন জ্বলছে, তা সহজে নিভবে না

বাংলা কবিতার হাজার বছরের যে দীর্ঘ পথচলা, সেখানে বাঁক বদলের মুহূর্তগুলো বড় অদ্ভুত। কখনো তা এসেছে ভোরের স্নিগ্ধ আলোর মতো, আবার কখনো কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো সব কিছু তছনছ করে দিয়ে। তিরিশের দশকের কবিরা যে আধুনিকতার বীজ বুনেছিলেন, তা সময়ের হাত ধরে সত্তরের দশকের উত্তাল, রক্তক্ষয়ী এবং অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসে এক ভীষণ রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। রোমান্টিকতার মায়াবী চাদর তখন ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার। বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর চারপাশের চেনা মানুষের চোখে অদ্ভুত এক অবিশ্বাস। ঠিক এরকম এক দমবন্ধ করা ক্রান্তিলগ্নে আবিদ আজাদ এমন একজন কবি হিসেবে এসে দাঁড়ালেন, যার কবিতা নিছক কিছু ছন্দ মেলানো শব্দের গাঁথুনি রইল না। তার কলম হয়ে উঠল এক আহত সময়ের দলিল। মানবসত্তার গভীরতম সঙ্কট, রাজনৈতিক দম বন্ধ করা পরিস্থিতি এবং নাগরিক জীবনের বীভৎস সব ট্র্যাজেডি যেন তার কবিতায় এক পরাবাস্তব আখ্যান হয়ে ধরা দিলো। তার কাব্যজগতে পা রাখলে পাঠকের মনে হতে পারে, এ যেন কোনো ছাপানো বইয়ের পাতা নয়; বরং এক জীবন্ত, স্পন্দিত ক্যানভাস- যেখানে যন্ত্রণাগুলো কথা বলে, আর দৃশ্যগুলো চোখের সামনে এসে নিঃশ্বাস ফেলে।

মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে, একটি সাধারণ শব্দ কীভাবে এতটা ধারালো হতে পারে? আবিদ আজাদের কবিতায় শব্দের সেই ধারালো রূপটি বারবার ফিরে আসে। নাগরিক জীবনের যে রূঢ় বাস্তবতা, যে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে একটি গোটা প্রজন্ম ধুঁকে ধুঁকে মরেছে, তার এক সুনিপুণ এবং জটিল বুনন তার কবিতাকে এক অদ্ভুত বহুমাত্রিকতা দিয়েছে। তার কবিতার পৃথিবীতে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির গোলকধাঁধায় হারিয়ে যান। কেমন সেই জগৎ? সেখানে ড্রয়িংরুমের অত্যন্ত দামি আর পরিপাটি আয়নার ওপর দিয়ে যখন একটি তেলাপোকা হেঁটে যায়, তখন তা শুধু একটি পোকা থাকে না; তা যেন আধুনিক মানুষের চকচকে জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পচন আর অবক্ষয়ের কথা কানে কানে বলে যায়। ঠিক মাকাল ফলের মতো- বাইরে চাকচিক্য, আর ভেতরে শুধুই শূন্যতা আর কালচে রূপ। আবার সেই একই কবি যখন পৃথিবীর সব ক্লান্তি আর পরাজয় নিয়ে বাবার হাতের তালুতে মুখ লুকানোর আকুতি জানান, তখন এক লহমায় যেন সব যান্ত্রিকতা মুছে গিয়ে এক শাশ্বত, আদিম মানবিক আশ্রয়ের দরজা খুলে যায়। তার এই যে বিশাল ক্যানভাস, এর মূল্যায়ন করতে গেলে তাই শুধু প্রথাগত সাহিত্যিক ব্যাকরণ দিয়ে বিচার করলে চলে না। পৃথিবীর নানা প্রান্তের দার্শনিক ও সাহিত্যিক তত্ত্বগুলো যেন অজান্তেই তার কবিতার ভাঁজে ভাঁজে এসে বাসা বেঁধেছে।

আবিদ আজাদের কাব্যিক ভাষার অন্যতম প্রধান একটি দিক হলো তার অবিনির্মাণ বা ভেঙে ফেলার প্রবণতা এবং তার পরাবাস্তব দৃষ্টি। তার কবিতায় দীর্ঘ বর্ণনামূলক কথার স্রোত আর নাটকীয় মুহূর্তের এমন এক অদ্ভুত মিলন ঘটে, যা কবিতাকে কেবল পড়ার জিনিস না রেখে, শোনার এবং দেখার মতো এক শ্রুতি-নাটকের স্তরে নিয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট শব্দ বা লাইন বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনার যে জাদু- যাকে সাহিত্যের ভাষায় অ্যানাফোরা বলা হয়, তাতে তিনি এক অভাবনীয় মহাকাব্যিক উত্তেজনা তৈরি করেন।

‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি

এক্ষুণি সেই কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করা হবে

এক্ষুণি বেআইনি বলে ঘোষিত হবে সেই কবিতার

প্রতিটি শব্দ

প্রতিটি দাঁড়ি কমা

প্রতিটি সেমিকোলন

নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে সেই কবিতার আপাদমস্তক চরণপুঞ্জ।

এখন যে কবিতাটি লিখব আমি

তার জন্য মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে নেমে আসবে

আরো একটি উত্থানের প্রাক-মুহূর্তের স্তব্ধতা

নেমে আসবে রাইফেলের নলের মতো

মৃত্যু-

আর সেই মৃত্যুর স্তব্ধতায় বাংলাদেশের আবহমান সবুজ রঙ

অন্ধকারের মতো কালো হতে হতে ভয়াল গর্জনে ফেটে পড়বে সমুদ্রের মতো।’

এই যে বারবার ফিরে আসা ‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি’ এটি পাঠকের বুকের ভেতর এক ধরনের চাপা প্রত্যাশা আর মানসিক চাপ তৈরি করে। ফরাসি দেশের সেই পুরনো প্রতীকবাদী কবিরা যেমন মন্ত্র পড়ার মতো করে কবিতা লিখতেন, এ যেন ঠিক তেমনই এক মন্ত্রোচ্চারণ। আর চিত্রকল্প? সেখানে তিনি যেন কোনো ঝানু চলচ্চিত্র পরিচালকের চেয়ে কম যান না। তার প্রতিটি শব্দ যেন ক্যামেরার এক একটি লেন্স। একটি বড় শহরের বুকে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ, সোডিয়াম আলোর নিচে একা হেঁটে যাওয়া কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ, কিংবা বাথরুমের শাওয়ার থেকে আচমকা ঝরে পড়া রক্ত- এই দৃশ্যগুলো তিনি এমন নিখুঁত তুলিতে আঁকেন যে, পড়ার সময় চোখের পাতা এক করতেও ভয় হয়। মনে হয়, এই বুঝি শহরের কোনো অন্ধকার গলি থেকে একটি ছায়া এসে সামনে দাঁড়াল। এই যে সিনেমাটিক বা দৃশ্যমান একটি আবহ, এটি তার কবিতাকে এমন এক গভীরতা দেয়, যেখানে পাঠক শুধু দর্শক থাকেন না, তিনি সেই দৃশ্যের একটি অংশ হয়ে যান।

তার কবিতার ভেতরের গল্পগুলোর দিকে যদি একটু গভীরভাবে তাকানো যায়, তবে এক ভয়ঙ্কর ডিস্টোপিয়ান বা ধ্বংসোন্মুখ জগতের ছবি ফুটে ওঠে। এই শহর কোনো রূপকথার নগরী নয়। আধুনিক যান্ত্রিক শহর, ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ, আর তার চেয়েও বেশি মানুষের মনের ভেতরে জমে থাকা দূষণ- এসব মিলিয়ে শহর যেন এক হাভাতে দানবের মতো হা করে আছে। জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার একসময় বলেছিলেন, আধুনিক প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতা কীভাবে মানুষের সত্তাকে গিলে খাচ্ছে। আবিদ আজাদের কবিতায় ঢাকা বা যেকোনো আধুনিক শহর ঠিক সেই আগ্রাসী রূপ নিয়েই হাজির হয়। এ এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিন মানুষের শারীরিক মৃত্যু না হলেও, আত্মিক মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। ভিড়ের মধ্যে মানুষ এখানে সবচেয়ে বেশি একা। টি এস এলিয়ট তার বিশ্বখ্যাত ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’-এ যে মৃত আর অনুর্বর এক ভূখণ্ডের ছবি এঁকেছিলেন, আবিদ আজাদের ঢাকা শহর যেন তারই এক স্যাঁতসেঁতে, ঘামে ভেজা বঙ্গীয় রূপ।

তপ্ত বালুতে জলের তৃষ্ণা যেমন মেটে না, এই কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষের আত্মার তৃষ্ণাও তেমনি দিন দিন কেবল বেড়েই চলে।

আশির দশকের সময়টা বড্ড অন্ধকারের। চারদিকে স্বৈরাচারী এরশাদের মিলিটারি বুটের শব্দ, সেন্সরশিপের কাঁচি আর রাতের অন্ধকারে মানুষের হারিয়ে যাওয়া। এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আবিদ আজাদের কলম জ্বলে উঠেছিল এক অন্ধকারের মশাল হয়ে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোতার লেখায় ‘প্যানোপটিকন’ বা নজরদারি রাষ্ট্রের যে ভয়ের ছবি এঁকেছিলেন- যেখানে রাষ্ট্র সবসময় তার নাগরিকদের ওপর নজর রাখছে, গলা টিপে ধরছে, আবিদ আজাদের কবিতায় সেই ভয়ের খুব জীবন্ত একটি রূপ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়, তার বিরুদ্ধে কবির অক্ষরগুলো হয়ে উঠেছিল শাণিত তলোয়ার। তার কাছে কবিতা তো কেবল বিকেল বেলায় বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে পড়ার মতো কোনো নরম জিনিস নয়; এ হলো শোষকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার হাতিয়ার। মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ লুই আলথুসার রাষ্ট্রের যে নিপীড়নমূলক যন্ত্রপাতির কথা বলেছিলেন- যেমন পুলিশ, জেলখানা- সগুলো আবিদ আজাদের কবিতায় সরাসরি উঠে এসেছে।

কিন্তু এখানেই তো সব শেষ নয়। এই যে এত কোলাহল, এত রক্ত, এত যান্ত্রিকতা, এর ঠিক মাঝখানেই আবিদ আজাদের ভেতরে এক অবাক করা নরম স্রোত বয়ে গেছে। যখন তিনি তার শেকড়ের কথা বলেন, ফেলে আসা শৈশবের কথা বলেন, তখন তার কবিতা যেন শ্রাবণের বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ হয়ে যায়। বাবা আর মায়ের প্রতিতার যে নির্ভরতা, যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, তা পড়ার সময় চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। আধুনিক জীবনের ইঁদুর দৌড়ে মানুষ যখন ক্লান্ত, পরাজিত হয়ে একটি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁপায়, তখন সে কোথায় যায়? দার্শনিক গ্যাস্টন ব্যাশলার্ড বলেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো তার শৈশবের বাড়ি, তার পুরনো স্মৃতি। আবিদ আজাদের কাছেতার বাবা-মা হলেন ঠিক সেই দার্শনিক আশ্রয়। দুনিয়ার সব লড়াইয়ে হেরে গিয়ে বাবার হাতের তালুতে মুখ লুকিয়ে একটুখানি শান্তি খোঁজার যে ছবি তিনি এঁকেছেন, তা এতটাই পবিত্র আর মানবিক যে, তা সরাসরি গিয়ে অন্তরে আঘাত করে।

মা-কে তিনি দেখেছেন এক চিরস্থায়ী প্রকৃতিররূপে। আজকালকার ইকো-ফেমিনিস্টরা বা পরিবেশবাদী নারীবাদীরা যেমন বলেন যে, এই ভোগবাদী সমাজ প্রকৃতিকেও ধ্বংস করছে, আবার নারীত্বকেও দাবিয়ে রাখছে- আবিদ আজাদের কবিতায় মা যেন সেসব ধ্বংসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক আদিম, সবুজ বৃক্ষ। এই কংক্রিটের রুক্ষ, নিষ্ঠুর শহরের ঠিক উল্টো দিকে মায়ের আঁচল যেন এক অকৃত্রিম, শীতল ছায়া। মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে তিনি এমন এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা এই ছাই হয়ে যাওয়া শহরের বুকেও এক ফোঁটা জলের মতো প্রাণের আশা জাগিয়ে রাখে।

আবার যখন বিচ্ছেদের কথা আসে, তখনতার কবিতায় এক জমাট বাঁধা বিষণœতা ভর করে। প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া যে বুকের ভেতর কতটা খাঁ খাঁ শূন্যতা তৈরি করতে পারে, তা তিনি এঁকেছেন গাঢ় নীল আর ছাই রঙের কালিতে। এই শূন্যতা কেবল একটি মানুষের চলে যাওয়ার কষ্ট নয়, এ যেন মানুষের অস্তিত্বেরই এক বড় সঙ্কট। জঁ-পল সার্ত্র মানুষের এই ‘নাথিংনেস’ বা অস্তিত্বহীনতা নিয়ে অনেক কঠিন কঠিন কথা বলে গেছেন। কিন্তু আবিদ আজাদ খুব সহজ করে, খুব গভীর ব্যথার সাথে সেই কথাটিই তার কবিতায় বলে দিলেন।

‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে জনহীন কোনো

পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে

একটি মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি

তোমাকে ঘিরে হা-হা করবে নিদাঘ রাত

দেখবে পর্যুদস্ত একটি হেলমেটের ফাটল দিয়ে দিয়ে মাথা

তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ

শুনবে ধ্বংস্তূপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো

আগুনলাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে

প্রেত হাসির শব্দ

তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা।’

এই কবিতায় কী এক অদ্ভুত হাহাকার লুকিয়ে আছে! জগতের এত আলো, এত ব্যস্ততা, এত কোলাহল- সব যেন একটা মানুষের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ করে অর্থহীন হয়ে যায়। আলবেয়ার কামু যে মহাবিশ্বের অর্থহীনতার কথা বলেছিলেন, সেটারই যেন এক মানবিক রূপ এই শূন্যতা। এত বড় একটা পৃথিবী, এত তারার মেলা, অথচ একটা মানুষের বুকের ভেতরের ব্যক্তিগত কষ্ট, তার কান্না- সব কিছু প্রকৃতির কাছে কত তুচ্ছ! কিন্তু সেই তুচ্ছ কষ্টটাই মানুষের কাছে কতটা পাহাড়সম হতে পারে, আবিদ আজাদ যেন সেই মরমি সত্যটিকেই ছুঁতে চেয়েছেন।

শব্দ নিয়ে তিনি যা করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ভাষার যে কাঠামোবাদ বা স্ট্রাকচারালিজম, যেখানে বলা হয় ভাষা দাঁড়িয়ে থাকে বিপরীতমুখী জিনিসের ওপর ভিত্তি করে, তার কবিতায় তা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। একদিকে তিনি ব্যবহার করছেন ‘শিউলি ফুল’, ‘মায়ের শাড়ির ঘ্রাণ’, ‘নরম রোদ’-এর মতো খুব মায়াবী, গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়া সব শব্দ। আর ঠিক তার পাশেই এনে দাঁড় করাচ্ছেন ‘যক্ষ্মার ফুল’, ‘গুইসাপের চামড়া’, ‘হ্যান্ডকাফ’, ‘সাদা ইদুর’-এর মতো শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামিয়ে দেয়া সব অস্বস্তিকর শব্দ। এই যে শব্দের ভেতরে আলো-আঁধারির যুদ্ধ, এটি তার কবিতাকে একটি অদ্ভুত দ্বান্দ্বিক রূপ দিয়েছে। তিনি যেন সজোরে ধাক্কা দিয়ে প্রথাগত সৌন্দর্যের ধারণাটিকে ভেঙে দিয়েছেন। কার্ল মার্ক্স যেমন সমাজে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছিলেন, আবিদ আজাদের কবিতায় যেন শব্দের ভেতরের সেই সংগ্রামটি স্পষ্ট। সেখানে তথাকথিত সুন্দর আর পরিপাটি শব্দগুলোর বিরুদ্ধে অধিকারবঞ্চিত, রূঢ় শব্দগুলো যেন এক প্রবল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

তার কবিতায় ছড়িয়ে থাকা প্রতীকগুলো নিয়ে ভাবলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনের অবচেতন স্তর নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, এই প্রতীকগুলো যেন সেই অন্ধকার জগতেরই বাসিন্দা। ‘রক্তাক্ত শাওয়ার’ বা ‘সাদা ইঁদুর’-এগুলো তো শুধু ভয় দেখানোর জন্য লেখা নয়। এগুলো হলো আমাদের নাগরিক জীবনের ভেতরে জমতে থাকা পাপবোধ, পচন আর পাশবিকতার নীরব সাক্ষী। সাদা ইঁদুর হয়তো কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারের জিনিস, কিন্তু আবিদ আজাদের কলমে তা ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের ড্রয়িংরুমে, আমাদের মগজের ভেতর ঢুকে পড়ে কুটকুট করে কাটতে থাকে। পরাবাস্তববাদের পুরোধা অঁদ্রে ব্রেতঁ অবচেতন মন আর স্বপ্নের যুক্তির কথা বলেছিলেন। স্বপ্নে যেমন অদ্ভুত সব জিনিস একসাথে মিলে যায়, আবিদ আজাদের কবিতায় ঠিক তেমনি বাস্তবের সাথে অবচেতন মিলেমিশে এক দুঃস্বপ্নের জন্ম দেয়। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপর তেলাপোকাকে যখন তিনি বসিয়ে দেন, তখন মানুষের বাহ্যিক রূপের অহঙ্কার আর ভেতরের কদর্যতা এক হয়ে এমন এক ছবি তৈরি করে, যা সহজে মন থেকে মোছা যায় না।

কবিতাতার কাছে একটি জীবন্ত সত্তা। এটি কোনো অলস দুপুরের বিনোদন নয়। তার চোখে কবিতা হলো এক বোমার মতো, যা ফেটে পড়লে রাষ্ট্রের ভিত পর্যন্ত কেঁপে উঠতে পারে। শিল্প যে কতটা ধ্বংসাত্মক আর একই সাথে কতটা বিপ্লবী হতে পারে, তার এক আশ্চর্য রূপ দেখা যায় এখানে। আবার এই একই কবি যখন প্রকৃতির কাছে ফেরেন, মা-কে কল্পনা করেন ‘সবুজ ডালপালা’ হিসেবে, তখন তিনি হয়ে ওঠেন এক বাউল। যে বাউল শহরের ধুলো মেখে ক্লান্ত, যে একটুখানি মাটির গন্ধ খোঁজে। একদিকে তিনি একজন পুরোদস্তুর নাগরিক মানুষ, যিনি শহরের সব যন্ত্রণা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন; অন্যদিকে তিনি এক শেকড়সন্ধানী পথিক, যে এই ইস্পাত-কঠিন দেয়াল ভেঙে আবার সেই আদিম সারল্যের কাছে, গ্রামের মেঠোপথের কাছে ফিরে যেতে চায়।

ফরাসি দার্শনিক দেরিদা যেমন সবকিছু ভেঙেচুরে নতুন করে দেখার কথা বলেছিলেন, আবিদ আজাদও তার নান্দনিকতার বোধ দিয়ে কুৎসিত, অসুন্দর আর বীভৎস জিনিসগুলোকেও শিল্পের এক অদ্ভুত মায়া দিয়েছেন। যা কিছু আমরা দেখতে চাই না, যা কিছু আমরা লুকিয়ে রাখতে চাই, তিনি সেটিকেই টেনে এনে কবিতার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এই যেতার সাহস, তার ভাষার এই যে বিদ্রোহ- এ তাকে শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর আধুনিক কবিতার একজন যোগ্য উত্তরসূরি করে তুলেছে। একটি রাজনৈতিক স্লোগান কীভাবে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হতে পারে, একজন মানুষের ব্যক্তিগত কান্না কীভাবে গোটা দেশের মানুষের আর্তনাদে মিশে যেতে পারে- আবিদ আজাদের কবিতা তার এক জ্যান্ত প্রমাণ।

মাঝে মধ্যে মনে হয়, সব তো বলা হলো, সব তো পড়া হলো; কিন্তু এরপর কী? এই যে এত কোলাহল, এত হাহাকার, এত পরাবাস্তব বিভ্রম- এ সবের শেষ কোথায়? হয়তো কোনো শেষ নেই। আবিদ আজাদ সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যিনি শব্দের জাদুতে আধুনিক মানুষের সবচেয়ে অন্ধকার, সবচেয়ে বিপন্ন একটি রূপকে অমর করে রেখে গেছেন। তার কবিতায় অস্তিত্ববাদের যে হাহাকার, যে ইকো-ফেমিনিজমের স্নিগ্ধ ছায়া আর মার্ক্সবাদের যে প্রতিবাদী আগুন জ্বলছে, তা সহজে নিভবে না। তিনি যেন কালের ক্যানভাসে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরাবাস্তব চিত্রকর, যিনি যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবাবেন। একটি বই বন্ধ করার পরও যেমন কিছু কথা মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, ঠিক তেমনি আবিদ আজাদের এই ডিস্টোপিয়ান আখ্যান পাঠকদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে নিজেদের ভেতরের এক অদ্ভুত শূন্যতার কাছে। যেখানে দাঁড়িয়ে হয়তো মানুষ নিজের কাছেই ফিসফিস করে প্রশ্ন করবে- এই যে এত যান্ত্রিকতা, এত দৌড়, এর শেষে কি সত্যিই বাবার হাতের তালুর মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে? নাকি আমরা সবাই শুধু নিয়ন আলোর নিচে হেঁটে যাওয়া এক একটি অর্থহীন, নিঃসঙ্গ ছায়া? এই প্রশ্নের হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই, আছে শুধু এক অনন্ত অনুভব।