বিশেষ সংবাদদাতা
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু জলবায়ুগত দুর্যোগ নয়, দণি এশিয়ার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও নগর উন্নয়নের জন্য অন্যতম বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে দণি এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ শ্রমঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত সঙ্কুচিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশিত ‘A Livable Future : Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South AsiaÕs Cities’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনের মূল তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দণি এশিয়ার শহরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত নগরায়ন হওয়া অঞ্চলগুলোর অন্যতম। ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের শহরগুলোতে প্রায় ২৫ কোটি নতুন মানুষ যুক্ত হবে এবং কর্মম জনগোষ্ঠী বাড়বে ২৮ কোটি। কিন্তু একই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দণি এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস এমন তাপমাত্রার মুখোমুখি হবে, যা মানুষের স্বাভাবিক কাজের সমতার জন্য বিপজ্জনক। বর্তমানে এ ধরনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা এর প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা। তীব্র গরমে কাজের সময় কমে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেক েেত্র শ্রমিকদের আয়ও কমে যাচ্ছে। একই সাথে শিল্প উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং নগর অর্থনীতির ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক আরো বলেছে, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে শহরগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও নি¤œ আয়ের মানুষের বড় অংশ নিরাপদ শীতলীকরণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বল্প আয়ের পরিবার, বস্তিবাসী, নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ তাপপ্রবাহের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অপরিকল্পিত নগরায়ন, কংক্রিটের বিস্তার এবং সবুজায়নের অভাবে শহরগুলোতে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব তাপমাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের দণি এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দণি এশিয়ার শহরগুলোই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
তার ভাষায়, ‘তাপ-সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষের জীবন রার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান সংরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করারও অন্যতম শর্ত।’
প্রতিবেদনটি বলছে, যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া গেলে এই তির বড় অংশ এড়ানো সম্ভব। এজন্য নগর পরিকল্পনা, আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে তাপ-সহনশীল নীতি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক পদেেপর কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ তাপ-সহনশীল ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ; নগর সবুজায়ন ও ছায়াযুক্ত উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি; কার্যকর হিট অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন; শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা; পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ; উন্নত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা; সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অর্থায়ন সহজলভ্য করা।
প্রতিবেদনে ভারতের আহমেদাবাদ, পাকিস্তানের কিছু শহর এবং দণি এশিয়ার বিভিন্ন নগরে বাস্তবায়িত হিট অ্যাকশন প্ল্যান, নগর সবুজায়ন ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে তাপজনিত মৃত্যুহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাজ্যের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতাবিষয়ক প্রধান জন ওয়ারবার্টন বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যের তি করছে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। এ সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকিকে এখনই উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে দণি এশিয়ার দ্রুত নগরায়ন ও জনমিতিক সম্ভাবনা অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়ার পরিবর্তে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।



