মহাসড়কে দুর্বৃত্তদের আতঙ্ক এআই ক্যামেরা

এস এম মিন্টু
Printed Edition
  • ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৬ ক্যামেরা, প্রস্তুত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা সড়কও
  • যুক্ত হচ্ছে ৪০০ বডিওর্ন ক্যামেরাও
  • সার্বক্ষণিক সেবায় ‘হ্যালো এইচপি’ অ্যাপ চালু
  • কমপ্লেইন সেলে ভিডিও পাঠালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সারা দেশের যোগাযোগের বড় অংশই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কনির্ভর। অপর দিকে দক্ষিণের বরিশাল ও খুলনাঞ্চলের জন্য যোগাযোগ সংযোগ হিসেবে পরিচিত ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। কিন্তু প্রতিদিন শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে এই দুই মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই গভীর রাতে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে যানবাহন চালক ও যাত্রীরা। শুধু ডাকাতই নয়, এই দুই মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। স্বজনদের কাছে ফেরার পথে ছিনতাই-ডাকাতদের অস্ত্রের মুখে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন পথেই। এসব অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবার দুই মহাসড়কে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

চাঁদাবাজি, হয়রানি, ডাকাতি-ছিনতাই, চোরাকারবারিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড নিরসনে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে বসছে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা। চলতি মাসের শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসড়কে এআই ক্যামেরার কার্যক্রম উদ্বোধন করবে হাইওয়ে পুলিশ।

হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিরসনে মহাসড়কগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধিসহ দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে এবং যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এআই ক্যামেরা। মহাসড়কের এআই ক্যামেরা ‘ইন্টেলিজেন্ট ও অপারেশনাল’ এই দুই ধাপে কাজ করবে। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশে যুক্ত হচ্ছে ৪০০ বডিওর্ন ক্যামেরা। রয়েছে হ্যালো এইচপি অ্যাপ, প্রবাসী হেল্প ডেস্ক ও কমপ্লেইন সেলও।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ফারুক আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে এআই ক্যামেরার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন হচ্ছে দ্রুতই। অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক এআই ক্যামেরার আওতায় নেয়া হচ্ছে। আধুনিক এই নজরদারি ব্যবস্থা মহাসড়কে ডাকাতি ও মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতাকে আরো জোরদার করবে। একই সাথে এটি যেকোনো দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে এবং যানজট নিরসনেও বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

মহাসড়কগুলো এআই ক্যামেরার আওতায় আসছে : পুলিশ সদর দফতর ও হাইওয়ে পুলিশের আওতাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে শক্তিশালী এআই ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এর মাধ্যমে অটো মামলা, চোরাচালান, ডাকাতি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ শনাক্ত করা যাবে। ১৬টি চেকপোস্টে ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক এআই ক্যামেরার কার্যক্রম চলছে। এখন দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হবে। চলতি মাসের শেষেই ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কগুলো এআইভুক্ত হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (পূর্ব) মুনতাসিরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২০২২-২৩ সাল থেকে সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত। বর্তমানে এই সড়কে এক হাজার ৪৭০টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এই ক্যামেরাগুলো এআইর আওতাধীন নেয়া হচ্ছে। মহাসড়কগুলো এআই ক্যামেরার আওতাধীন হলে চাঁদাবাজি, চোরাচালান, ডাকাতি-ছিনতাই, ওভার স্পিডসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড নিরসন হবে। যানবাহন চলাচলেও সড়ক দুর্ঘটনা কমবে বলেও আশা করছেন।

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কেও এআই ক্যামেরা : ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কেও এআই ক্যামেরার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (দক্ষিণ) মীর মোদ্দাছছের হোসেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকেই এই মহাসড়কের এআই ক্যামেরা চালু হবে। দক্ষিণ অঞ্চল বলতে ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা সড়ক বুঝানো হলেও এটি মূলত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে এআই ক্যামেরার আওতাধীন আসবে। এই অঞ্চল এআই ক্যামেরার আওতায় এলে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কার্যক্রম কমে আসবে বলেও মনে করছেন হাইওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এআই ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক অপরাধ মুক্ত হয়েছে। সেই আলোকে আমাদের দেশের মহাসড়ক এআইভুক্ত হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে বলে আশা রাখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, মহাসড়ক এআইভুক্ত করলেই হবে না। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে হবে এবং দুর্গম সড়কে যেখানে ডাকাতি-ছিনতাই এর প্রবণতা বেশি সেই স্থানগুলো এআই ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বললেন, সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পর অনেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেখা যেত কোনো ঘটনা ঘটলেই সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায় না। আগে ও পরের ফুটেজ রয়েছে, তবে ঘটনার সময়ের ফুটেজ থাকছে না। তাই এআই ক্যামেরার ক্ষেত্রেও যেন এমন না হয়। রাজনৈতিক বাধা, পক্ষপাতিত্ব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে যেন এর কার্যক্রম আটকে না যায় এ বিষয়গুলো দেখতে হবে।

হাইওয়ে পুলিশের সদর দফতর সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক হাজার ৪৭০টি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। এ ছাড়াও পরীক্ষামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি চেকপোস্টে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কেও নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে হাইওয়ে পুলিশ কেন্দ্রীয়ভাবে এই দু’টি প্রধান মহাসড়কে নজরদারি করবে। এই মহাসড়কে ছিনতাই-ডাকাতি ও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ এবং নির্বিঘেœ যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতেই হাইওয়ে পুলিশের এই এআই ক্যামেরা স্থাপন প্রধান কাজ।

মহাসড়কে দুই ধাপে এআই ক্যামেরার কার্যক্রম : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৫০ কিমি. আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন ভিডিও সার্ভিলেন্স সিস্টেমের আওতাধীন। এই মহাসড়কে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত। এটি প্রতিনিয়ত ট্রাফিক নজরদারি ও অপরাধ দমনে সহায়তা করছে।

সূত্র আরো জানায়, মহাসড়কে এআই ক্যামেরা দুই ধাপে কাজ করছে। প্রথমত. ইন্টেলিজেন্ট ফিচারসের কাজ করে। এখানে ডিজিটাল অটো ফাইন সিস্টেম, ট্রাফিক সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস, ভেহিক্যাল সার্চ, বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস, ভেহিক্যাল মনিটরিং, ট্রাফিক ভায়োলেসন অ্যানালাইসিস, ডে-ওয়াইজ চেক পয়েন্ট সামারি, ভিডিও সিনোপসিস সার্চ ও ইন্টেলিজেন্ট টাস্ক। দ্বিতীয়ত. অপারেশনাল কার্যক্রম, যার মধ্যে মহাসড়কে সার্বক্ষণিক নজরদারি, অপরাধ দমন-নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তে সহায়তা, অটোমেটিক নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ, ক্লোন নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ, হাইস্পিড ডিটেকশন, অবৈধ ও অনুমোদনহীন যানবাহন শনাক্তকরণ, ট্রাফিক ফ্লো অ্যানালাইসিস, ডিজিটাল ফরেনসিক ও অপরাধী শনাক্তকরণ ও অটোমেটিক ডকুমেন্ট চেকিং করা হবে।

হাইওয়েতেও ৪০০ বডিওর্ন ক্যামেরা : অপরাধ দমনে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালীন হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জদের সাথেও থাকছে বডিওর্ন ক্যামেরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের সকল থানায় ৪০০টি বডিওর্ন ক্যামেরা সরবরাহ করা হয়েছে। বডিওর্ন ক্যামেরা মাঠপর্যায়ের সব কার্যক্রম কন্ট্রোল রুম থেকে সরাসরি মনিটরিং করা হচ্ছে। ধারণকৃত ভিডিও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। সিনিয়র কর্মকর্তারা অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করেন।

হ্যালো এইচপি অ্যাপ চালু : প্রযুক্তিগতভাবে অপরাধ দমনে হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে ‘হ্যালো এইচপি’ অ্যাপ চালু করেছে। অ্যাপটি সেবাগ্রহিতা ও মহাসড়কে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন নিশ্চিত করবে। সেবা প্রত্যাশী ‘হ্যালো এইচপি’ অ্যাপের জরুরি সাহায্য বাটনে চাপ দিলে নিকটবর্তী টহল টিম সেবাগ্রহিতার কলটি গ্রহণ করবে। কোনো কারণে তিনি গ্রহণ না করলে কলটি পরবর্তী নিকটতম টহল টিমের নিকট স্থানান্তরিত হবে। তিনিও কল গ্রহণ না করলে কলটি পরে সরাসরি কন্ট্রোল রুমে চলে যাবে। কল রিসিভ হলে সেবা প্রত্যাশী ও টহল টিমের অফিসার উভয় উভয়ের লোকেশন দেখতে পারবে। ফলে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া এই অ্যাপে যেকোনো অভিযোগ কিংবা পরামর্শ প্রদান করা যাবে এবং মহাসড়ক সংক্রান্ত সকল প্রকার আপডেট পাওয়া যাবে।

প্রবাসীদের জন্য প্রস্তুত হেল্প ডেস্ক : বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের টার্গেট করে সঙ্ঘবদ্ধ চক্র মহাসড়কে ছিনতাই-ডাকাতি করে। প্রায়ই এই ঘটনা ঘটলে হাইওয়ে পুলিশ প্রবাসীদের জন্য প্রস্তুত করেন প্রবাসী হেল্প ডেস্ক। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আগত প্রবাসীদের হাইওয়েতে চলাচলের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে হাইওয়ে পুলিশ একটি হেল্প ডেস্ক স্থাপন করেছে। যার ফলে প্রবাসী হেল্প ডেস্কে যোগাযোগ পূর্বক হাইওয়ে পুলিশের সহায়তা নিয়ে দিনে বা রাতে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে বলেও জানানো হয়।

হাইওয়ে পুলিশের কমপ্লেইন সেল : হাইওয়ে পুলিশ জানায়, মহাসড়কে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা সংগঠিত হলে বা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম সংক্রান্তে কোনো অভিযোগ বা কোনো সুপারিশ থাকলে সরাসরি অ্যাডিশনাল আইজিপির স্পেশাল (০১৩২০-১৮২২০০) নম্বরে (ডিজিটাল প্রমাণসহ) পাঠালে তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে ২০০৫ সালের ১১ জুন প্রতিষ্ঠিত হাইওয়ে পুলিশ। বর্তমানে চারটি বিভাগ, সাতটি ক্যাম্প, আটটি রিজিয়ন, ১০টি সার্কেল ও ৭৩টি থানাসহ দুই হাজার ৮১৪ জন জনবল নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম চলছে। জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই ইউনিট প্রায় ১১ হাজার ৮০৬ কিলোমিটার মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব পালন করছে।