একান্ত সাক্ষাৎকারে জামায়াত প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন

ঢাকা-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট বিপ্লব ঘটবে

নির্বাচিত হলে তিনি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকা-৪ এলাকাকে আধুনিক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন, কর্মসংস্থানমুখী, পরিচ্ছন্ন ও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিমুক্ত নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করছেন ঢাকা-৪ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে শ্যামপুর, কদমতলী ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাস করে নানামুখী সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। ৫ আগস্টের পর প্রতিটি পাড়া মহল্লায় মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম। এ ছাড়া এবার মানুষও বিগত সময়ের অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃৃতির পরিবর্তন চাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে ঢাকায় জামায়াতের যেসব আসনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ঢাকা-৪ তার মধ্যে অন্যতম জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমি যথেষ্ট আত্মবিশ^াসী। নির্বাচিত হলে তিনি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকা-৪ এলাকাকে আধুনিক নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন, কর্মসংস্থানমুখী, পরিচ্ছন্ন ও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিমুক্ত নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সম্প্রতি নয়া দিগন্তের সাথে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী নির্বাচন নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। নিচে সাক্ষাৎকারটি তুল ধরা হলো-

নয়া দিগন্ত : আপনার দৃষ্টিতে আপনার নির্বাচনী এলাকার সমস্যা কী কী?

উত্তর : আমার এলাকার প্রধান কয়েকটি সমস্যা হলো অপরিকল্পিত আবাসন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি। এ ছাড়া যানজট, বেকারত্ব, কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং, মশা, বুড়িগঙ্গার পানির দুর্গন্ধ, ডিআইটি ও খাসমহলের বাড়িঘর সঙ্কট এবং মাদকসংক্রান্ত ঝুঁকি। তা ছাড়া ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও পানির সঙ্কট এবং তা স্থানীয় ব্যবসায়িক পরিবেশের চ্যালেঞ্জও জনগণের বড় ভোগান্তি তৈরি করছে।

নয়া দিগন্ত : নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে আপনি কী কী পদক্ষেপ নেবেন?

উত্তর : আমি জনগণের সাথে আলোচনা করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে একটি তালিকা তৈরি করব। এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হবে। যোগাযোগব্যবস্থা, রাস্তা-ড্রেনসহ অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থা করা, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এ ছাড়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে বেকার যুবকদের কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে কাজের ব্যবস্থা করা হবে। পরিবেশবান্ধব ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা নিরসন পরিকল্পনা, নাগরিক সেবা সহজ করতে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। আমি প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করব। বুড়িগঙ্গার পানি বিশুদ্ধকরণে উদ্যোগ নেয়া হবে।

নয়া দিগন্ত : আপনার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

উত্তর : ৫৪ বছর ধরে মানুষ শাসনের নামে শোষণের শিকার হয়েছে। দুর্নীতি-চাঁদাবাজির শিকার হয়েছে। বিপরীত দিকে জামায়াত সবসময় দুর্র্নীতিমুক্ত একটি দল। আমরা সৎ লোকের শাসনের কথা বলছি। আমাদের দু’জন শীর্ষ নেতা মন্ত্রী ছিলেন সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। জেলা-উপজেলা চেয়ারম্যান-মেম্বার যারা ছিলেন তারাও দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন। এ জন্য মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছে। এবার জামায়াতের প্রার্থীদের ভোট দিতে মানুষ মুখিয়ে আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে এবার ঢাকা-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট বিপ্লব ঘটবে ইনশা আল্লাহ।

নয়া দিগন্ত : নারীদের বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?

উত্তর : ইসলাম নারীকে সম্মান দিয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের বেশি সম্মান দিয়েছে। এ জন্য আমরাও নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। নারী-উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য নারীরা যেন ন্যায্য সুযোগ পায় এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে মর্যাদার সাথে এগিয়ে যেতে পারে।

নয়া দিগন্ত : যুবকদের নিয়ে আপনাদের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?

উত্তর : যুবকরা দেশের সম্পদ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বেকার হয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য তাদের কারিগরি, ডিজিটাল ও পেশাগত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনাসুদে ঋণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সহায়তা, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা হবে। আমরা চাই তরুণরা দক্ষ হোক, কর্মসংস্থান তৈরি করুক এবং সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখুক।

নয়া দিগন্ত : মাদক নির্মূলের বিষয়ে আপনাদের কর্মসূচি কী?

উত্তর : মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। আমরা স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা অভিযান, স্কুল-কলেজে নিয়মিত কাউন্সেলিং, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি, পুনর্বাসন কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং মাদককারবারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব। আমরা তালিকা করছি কারা কারা এ কারবারে সাথে জড়িত। তাদের আগে সচেতন করার চেষ্টা করব। নাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নয়া দিগন্ত : ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেবেন?

উত্তর : শ্যামপুর এলাকায় একটি শিল্পাঞ্চল রয়েছে। যেখান থেকে পুরো এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় উদ্যোগের জন্য বিনাসুদে ঋণ, বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, লাইসেন্স-নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, চাঁদাবাজমুক্ত নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

নয়া দিগন্ত : এলাকার ভোটারদের প্রতি আপনার কী ধরনের আহ্বান থাকবে?

উত্তর : সারা দেশের মতো ঢাকা-৪ আসনকে একটি নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। আগামীতে জনগণ আমাকে নির্বাচিত করলে ঢাকা-৪ আসনকে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ-দুর্নীতিমুক্ত একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য মানবিক এলাকা হিসেবে জনগণকে উপহার দেয়া হবে। কোনো বাড়িওয়ালাকে এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। কারো প্লট-ফ্ল্যাট কেউ দখল করার স্বপ্নও দেখবে না। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, অবৈধ দখলদারদের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। জনভোগান্তি দূরীকরণে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদুৎ ও পানি সরবরাহের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুদের মেধা বিকাশে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের আয়োজন করা হবে। মাদকমুক্ত করতে যুবসমাজের জন্য খেলাধুলা ও শরীরচর্চার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা করা হবে। ‘আমার ঢাকা, আমাদের ঢাকা; গড়ব মোরা একসাথে’ স্লোগানে ঢাকা-৪ সংসদীয় এলাকাকে নতুন বাংলাদেশের মডেল হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

এ জন্য তিনি জামায়াতে ইসলামীকে পরীক্ষামূলক একবার নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচয় : সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার চরামদ্দি ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম সাইয়্যেদ বংশে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম সৈয়দ হোসেন আলী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ সালে পশ্চিম চরাদী ছালেহিয়া সিনিয়র মাদরাসা থেকে বৃত্তিসহ দাখিল পাস করেন। এরপর আলিম, ফাজিল এবং কামিল সম্পন্ন করেন দুর্বাটি আলিয়া মাদরাসা থেকে। পরে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে অ্যাকাডেমিক লেখাপড়া শেষ করে কিছুদিন ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইসলামী অর্থনীতির প্রতি অনুরাগী হয়ে ব্যবসা ছেড়ে ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হন। ইসলামী অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংকিং-এর ওপর তিনি গবেষণাধর্মী বিভিন্ন লেখনী ও কর্মের মাধ্যমে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তার একাধিক পুস্তক পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ১৯৮২ সালে স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় ঢাকা-৪ আসনের ঢালকানগর এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন এবং ১৯৮৯ সাল ছাত্রজীবন থেকেই ঢাকা-৪ আসনের ৫৪, ৫৩, ৫২, ৫৮ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেছেন। বর্তমানে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের খন্দকার রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ জন্য ঢাকা-৪ আসনের সমস্যা ও সম্ভাবনার সবগুলো বিষয় সম্পর্কে তিনি ওয়াকিফহাল।

তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা পারভীন ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মহিলা বিভাগীয় সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের দুই কন্যা সন্তানের একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং অপরজন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত।

সৈয়দ জয়নুল আবেদীন গড়ে তুলেছেন বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : তা’লীমুল মিল্লাত ইসলামিয়া মাদরাসা, তা’লীমুল উম্মাহ মাদরাসা, কর্ডোভা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, তা’লীমুল উম্মাহ হিফজুল কুরআন মাদরাসা, সানবিম গ্রামার স্কুল, খন্দকার গিয়াস উদ্দিন জামেয়া দারুল আরকাম ও এতিমখানাসহ আর অনেক স্কুল, মাদরাসা, হিফজখানা ও এতিমখানা। তিনি এলাকার বহু সামাজিক কার্যক্রমের সাথে জড়িত, গরিব-দুঃখী-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা-চিকিৎসা ও দাওয়াতি কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন।

মশকনিধন কর্মসূচি, শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ, দুস্থ ও দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ, অসহায় নারীদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, পাড়া-মহল্লায় গণসচেতনতা সৃষ্টি ও দাওয়াতি কার্যক্রমে তিনি অনবদ্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। করোনাকালীন সঙ্কটময় মুহূর্তেও তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদানসহ মসজিদ, মাদরাসা, ইয়াতিমখানায় তার অবদান অনন্য। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের পর থেকে শ্যামপুর-কদমতলী এলাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে জয়নুল আবেদীন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য।