নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে গাজার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভয়াবহই রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র প্রধান ফিলিপ লাজারিনি। তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক’ যুদ্ধবিরতির আড়ালে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, খাদ্য ও পানির সঙ্কট এবং রোগব্যাধির বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
লাজারিনি জানান, গাজায় বড় পরিসরে মানবিক সহায়তা দেয়ার মতো কার্যকর সংস্থা হিসেবে ইউএনআরডব্লিউএ এখনো প্রধান ভূমিকা পালন করছে, তবে তীব্র অর্থসঙ্কটে তাদের কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে। তিনি সতর্ক করেন, সংস্থাটির ওপর চাপ বা আক্রমণ ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্যও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও হামলা বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। একই সাথে হাজার হাজার মানুষ এখনও বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জাতিসঙ্ঘের ওসিএইচএ’র মুখপাত্র ওলগা চেরেভকো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে গাজার সঙ্কট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটাই উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ শরণার্থী শিবিরে বা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছে এবং প্রতিদিনই হামলা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতেও সঙ্কট তীব্র। মাত্র ৪২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আংশিকভাবে চালু রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো ধ্বংস, সহায়তা প্রবাহে সীমাবদ্ধতা এবং চলমান সহিংসতার কারণে গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যত কাগুজে হয়ে আছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় হামলা, পশ্চিম তীরে অচলাবস্থা
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে, যা এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক হামলায় জাবালিয়া, খান ইউনুস ও মাওয়াসি এলাকায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতে মোট নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানান হয়েছে। অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে ইসরাইলের মৃত্যুদণ্ড আইনকে কেন্দ্র করে। এই আইনের প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘট পালন করেছে ফিলিস্তিনিরা, যার ফলে দোকানপাট, স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন আইনে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সুযোগ রাখায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মতে, এ আইনের আওতায় শতাধিক বন্দী মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এদিকে, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এই আইনকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় চলমান হামলা ও পশ্চিম তীরে নতুন আইন- উভয়ই অঞ্চলে অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে।
মৃত্যুদণ্ড আইনে আতঙ্ক পশ্চিম তীরে
ইসরাইলের নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনকে কেন্দ্র করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দীদের জন্য এই আইনকে ‘নিষ্ঠুর ও বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক মহল। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। নতুন আইনের অধীনে পশ্চিম তীরে সামরিক আদালতে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বিবেচিত কোনো হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেহেতু ফিলিস্তিনিদের বিচার সাধারণত সামরিক আদালতেই হয়, তাই এটি কার্যত তাদের জন্য আলাদা ও কঠোর বিচার ব্যবস্থা তৈরি করছে।
রামাল্লায় এক বিক্ষোভে অংশ নেয়া মাইসুন শাওয়ামরেহ বলেন, তার ছেলে তিন বছর ধরে কারাগারে রয়েছে এবং এখন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। ‘গত রাত আমরা কেউ ঘুমাতে পারিনি’ বলেন তিনি। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইন বিচার ব্যবস্থায় দ্বৈত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করছে। যেখানে ইসরাইলি নাগরিকদের জন্য বেসামরিক আদালতে বিকল্প শাস্তি রয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে কঠোরতম শাস্তি প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ এই আইনকে ‘নিষ্ঠুর ও বৈষম্যমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, এই আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং দখলকৃত অঞ্চলে এটি প্রয়োগ করা হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক আদালতগুলোর ৯৬ শতাংশ দণ্ডাদেশের হার এবং জোর করে স্বীকারোক্তির অভিযোগ এই আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এ ছাড়া নতুন আইনে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং ৯০ দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়নের বিধানও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলের ভেতরেও এই আইনের বিরোধিতা দেখা গেছে। তেল আবিব ও জেরুসালেমে বিক্ষোভকারীরা এটিকে ‘অমানবিক’ ও ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ দিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে আইনটি বাতিলের আবেদন করেছে। তাদের মতে, এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং একটি বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।



