জিজ্ঞাসাবাদের পর মুচলেকা দিয়ে মুক্ত, যুবদল থেকে বহিষ্কার

সোনারগাঁওয়ের এমপির ছেলের নানা অপকর্ম

Printed Edition

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে নেয়া নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীব জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আর কোনো অপকর্ম করবে না এমন মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছে। রোববার রাত দেড়টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে সজীবকে ডিবিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার বক্তব্য যাচাই-বাছাই করার পর মুচলেকা নিয়ে রাত ১টা ৩০মিনিটে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এ দিকে সজীবকে আটক প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনো বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে সবাই সমান। সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, পুলিশের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। সেগুলোর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তারা তাকে নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং প্রয়োজন মনে করেছে মুচলেকা নেয়ার।

জানা গেছে, সম্প্রতি একটি শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসেন। সেখানে মন্ত্রীর কাছে এমপি ছেলের অপকর্ম তুলে ধরে প্রতিকার চান ওই শিল্প গ্রুপের কর্ণধার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করলে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। সাথে সাথেই অ্যাকশন শুরু হয়ে যায়। ইতোমধ্যে সজীবকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করছে কেন্দ্রীয় কমিটি।

এ দিকে এমপি মান্নানের ছেলে সজীবের চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। পাশাপাশি বেরিয়ে এসেছে তার চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলনসহ নানা অপর্কমের খবর। ভুক্তভোগীরা তার অপকর্মে অতিষ্ঠ বলে জানান অনেকে।

জানা যায়, সজীব নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর সারা দেশে অচলাবস্থা বিরাজ করে। পরদিন থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত মেঘনা টোল প্লাজায় রসিদ ছাড়া টোল আদায় করে টাকা লুটে নেয় সজিব ও তার বাহিনী। তিন দিনে প্রায় আড়াই কোটি টাকা টোল প্লাজা থেকে লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ। এ ছাড়া মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে ২০-২৫টি ড্রেজার বসিয়ে রাতের আধারে বালু লুটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার বাবা আজহারুল ইসলাম মান্নান সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি হওয়ায় নেতাকর্মীরা তাদের অনুসারী হয়ে কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, সজীব ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার জমি দখল, চাঁদাবাজির শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ পতনের পর থেকে তিনি মেঘনা গ্রুপের ২৭টি ইউনিটে জুট ব্যবসা নিজের কব্জায় নিয়ে নেন। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে সরকারি কোষাগারে জমা ১ শতাংশের টাকা সংশ্লিষ্টদের সাথে আঁতাত করে ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের নামে টাকা লুট করে নিয়ে যায়। যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হওয়ার কথা থাকলেও উন্নয়নের টাকা লুটে নিয়ে যায়।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সজীবের নেতৃত্বে সোনারগাঁয়ে অর্ধশতাধিক চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে উঠেছে। সরকারি গ্যাস অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন। সজীবের চাঁদাবাজির সব টাকা আদায় করেন তার বাবার পিএস সেলিম হোসেন দিপু। সজীবের সব অপকর্মে সহযোগিতায় থাকেন এ দিপু। মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব অপকর্মে তার হাত রয়েছে। সজীবের আধিপত্যে অসহায় খোদ ইউএনও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও সমন্বয় সভায় সদস্য না হয়েও প্রতিটি সভায় উপস্থিত হয়ে সংসদ সদস্য বাবা মান্নানের প্রভাবে বক্তব্য রাখছেন।

মেঘনা গ্রুপের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সোনারগাঁওয়ে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক জোনের ফ্যাক্টরিগুলোতে এমপি মান্নানের অনুসারীদের দখলদারিত্ব শুরু হয়। ইকোনমি জোনের ভেতরের সব ফ্যাক্টরির নির্মাণ-সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, সাপ্লাই, নদী খননের কাজসহ সব কিছু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, সর্বশেষ মাসিক চাঁদা হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয় মেঘনা গ্রুপকে। আর এসবই হয়েছে এমপি ছেলের নির্দেশে।

এ দিকে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে সজীবকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রোববার রাতে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো অপকর্ম দল নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে খাইরুল ইসলাম সজীবের বক্তব্য নিতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।