স্থিতিশীল ডলার-টাকার বিনিময় হার অস্থিরতা নেমেছে সর্বনি¤œ পর্যায়ে

স্বস্তি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে টাকার বিনিময় হার উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল ছিল। ডলার-টাকার ওঠানামা নেমে এসেছে সর্বনি¤œ পর্যায়ে। বৈদেশিক লেনদেনে সক্ষমতা বাড়ায় এবং আমদানি চাপ কম থাকায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। তবে টাকার অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে ৯২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে। আর চলতি বছরের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডলার কিনেছে ৩০৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপে এক দিকে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে, অন্য দিকে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট রিজার্ভ (বিপিএম-৬) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে। আর ২৪ ডিসেম্বরে তা আরো বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি তিন মাস অন্তর ডলার ও টাকার বিনিময় হার নিয়ে বিশ্লেষণ মূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় গত সেপ্টেম্বরের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মাসের শেষ দিকে ডলার কেনার প্রভাবে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর সামান্য বেড়ে প্রতি ডলার ১২১ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়ায়, যা আগস্ট শেষে ছিল ১২১ টাকা ৬৯ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারের ভোলাটিলিটি নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশে। বাজারে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বিনিময় হারের ব্যপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সময়োপযোগী নীতিগত হস্তক্ষেপের ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফিরেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘এক্সচেঞ্জ রেট অ্যান্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট ডাইনামিকস’ শীর্ষক সেপ্টেম্বর ২০২৫ মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে আন্তঃব্যাংক ডলার বিনিময় হার খুবই সঙ্কীর্ণ সীমার মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। আগস্টের শেষে যেখানে আন্তঃব্যাংক হার ছিল প্রতি ডলার ১২১ টাকা ৬৯ পয়সা, সেপ্টেম্বরের শেষে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকা ৮০ পয়সায়। এই সামান্য অবমূল্যায়ন মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীল সরবরাহ ও দুর্বল আমদানি চাহিদার কারণে সেপ্টেম্বর মাসে টাকার ওপর স্বাভাবিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হয়। তবে বাজারে হঠাৎ টাকার অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। মাসজুড়ে নিলামের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৯২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কৌশলগত হস্তক্ষেপ এক দিকে যেমন বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রেখেছে, অন্য দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতেও সহায়ক হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগস্ট শেষে ছিল ২৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।

বিনিময় হারে অস্থিরতা সর্বনি¤œ

সেপ্টেম্বর মাসে ডলার-টাকার বিনিময় হারের অস্থিরতা বা ভোলাটিলিটি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। পাঁচ দিনের চলমান মানদণ্ডে আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারের ভোলাটিলিটি নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনি¤œ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বেলা ১১টা এবং বিকেল ৫টা পর্যন্ত লেনদেনের ভিত্তিতে নির্ধারিত রেফারেন্স রেটও পুরো মাসে প্রায় একই ধারায় ছিল। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার কেনাবেচার ক্ষেত্রে অস্থিরতা খুব কম থাকলেও ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যকার ডলার বিক্রির দামে কিছুটা তারতম্য দেখা গেছে।

কমেছে স্প্রেড, বেড়েছে লেনদেন

বাজারে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বিনিময় হারের স্প্রেডও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আন্তঃব্যাংক বাজারে দৈনিক গড় স্প্রেড নেমে এসেছে মাত্র ৫ পয়সায়। তবে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের কাছে ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে গড় স্প্রেড ছিল তুলনামূলক বেশি, প্রায় ১ টাকা ৬১ পয়সা।

অন্য দিকে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক গড় স্পট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার, যা আগস্টে ছিল ৩৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। মোট লেনদেনের প্রায় ৩১ শতাংশ ছিল স্পট ট্রানজ্যাকশন, বাকি অংশ মূলত সোয়াপ লেনদেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বাজারে লেনদেন প্রায় পুরোপুরি মার্কিন ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল। ইউরোসহ অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেন ছিল খুবই নগণ্য।

শক্তিশালী বৈদেশিক খাত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের শুরুতে দেশের বৈদেশিক খাতের ভিত্তি ছিল বেশ শক্ত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪৮৩ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯১ মিলিয়ন ডলার। রফতানি আয় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বছরে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্য দিকে একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা মূলত তৈরী পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানির কারণে। রেমিট্যান্স প্রবাহও ছিল শক্তিশালী। সরকারি চ্যানেলে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।

সামগ্রিক চিত্র

বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বর মাসে টাকার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা দেশের বৈদেশিক অর্থনীতিতে আস্থার প্রতিফলন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ বাজারকে অযাচিত অস্থিরতা থেকে রক্ষা করেছে। তবে রিয়াল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেটের ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।